
বিশ্বের দরিদ্রতম দেশ সমূহের নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিকগণ এবং বিজ্ঞানীগণ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তদের দেশের উপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ে সে সম্পর্কে স্বদেশ বাসীদের প্রস্তুত করা নিয়ে ব্যাপক দুশ্চিন্তার মধ্যের রয়েছেন।
বিশ্বের বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশের গবেষক এবং শিক্ষাবিদগণ জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে সচেতন করার জন্য ইসলাম ধর্ম থেকে অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন।
এরাবিয়ান গালফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘Innovation and Technology Management Department’ এর অধ্যাপক এবং ‘Islam and Sustainable Development’ নামক বইয়ের লেখক ওদেহ রাশিদ আল-জাইউসি বলেন, ‘ইসলাম মানব জাতী কে প্রাকৃতিক পরিবেশের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দেখে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘মানুষকে জীবিত যে কোনো প্রাণীর যত্ন করার প্রতিদান দেয়া হবে। প্রত্যেক প্রাণী ইবাদতের মধ্য রয়েছে সুতরাং কোন প্রাণী কে অযথা বিরক্ত করা বা আঘাত দেয়ার অর্থ হচ্ছে তার ইবাদতের মধ্যে ব্যাঘাত ঘটানো।’
পবিত্র কুরআন এবং নবী মুহাম্মদ(সা:) এর হাদিসের মধ্যে প্রাকৃতিক পরিবেশের রক্ষণা বেক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অনেক মুসলিম প্রকৃতি বিজ্ঞানী পবিত্র কুরআনের এই আয়াত টি প্রকৃতি সুরক্ষার সচেতনতার ক্ষেত্রে ব্যাবহার করে থাকেন- ‘আল্লাহর দেয়া রিযিক খাও, পান কর আর দুনিয়ার বুকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে বেড়িও না।’
আল-জাইউসি বলেন, ‘সাম্য বজায় রাখার জন্য ইসলাম মানব জাতীর মধ্যে আশাবাদী মনোভাব তৈরী করতে চায়।’ বৈচিত্র্য এবং সৌন্দর্য রক্ষা করা একধরনের ইবাদত। প্রকৃতি এবং মহাশূন্যের মধ্যে যে চিহ্ন রয়েছে তাতে মানব জাতীর অনেক কিছু শেখার রয়েছে।’
প্রকৃতি তত্ত্ব বিজ্ঞান আমাদের কে ধর্মের বিষয় সমূহ স্মরণ করিয়ে দেয় যা আমাদের সাথে প্রকৃতির সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে এবং মুসলিমরা বিশ্বাস করে যে, প্রকৃতি সুরক্ষার জন্য মানব জাতির আধ্যাত্মিক দায়িত্ব রয়েছে।
‘Hasan Kalyoncu University’ এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট এবং ‘The Ethical Dimension of Human Attitude Towards Nature: A Muslim Perspective’ নামক বইয়ের লেখক ইব্রাহিম ওজদেমির বলেন, ‘মুসলিম গবেষক, ধর্মীয় নের্তৃ বৃন্দ, মসজিদ এবং ধর্মীয় কমিউনিটি সবসময় প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করে থাকে।’
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ইন্দোনেশিয়া এ ক্ষেত্রে সফলতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। দেশটির ধর্মীয় নের্তৃ বৃন্ধ এবং সরকারি কর্মকর্তা বৃন্ধ ইসলামিক শিক্ষার সাথে সমন্বয় করে প্রকৃতি বিজ্ঞান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে নাগরিকদের সচেতন করার জন্য যুতসই উদ্যোগ নিয়েছেন এবং প্রকৃতি সুরক্ষায় নাগরিকদের ধর্মীয় দায়িত্বের দিকটি তুলে ধরার মাধ্যমে দ্বীপ রাষ্ট্রটি দীর্ঘ বন উজাড় হয়ে যাওয়ার ইতিহাস থেকে মুক্তি পেয়েছে।
প্রকৃতি সুরক্ষায় ইন্দোনেশিয়ার গৃহীত এমন সফল পদক্ষেপ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশ যেমন কাতার এবং তুরস্ক ইতোমধ্যে গ্রহণ করেছে। ইসলাম ধর্মে প্রকৃতি সুরক্ষার বিষয়ে গুরত্বারোপ করে মুসলিমরা প্রকৃতি সুরক্ষা তত্ত্বের যথাযথ প্রয়োগ ঘটিয়ে চলেছে।
জাতিসংঘের বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আল-জাইউসি বলেন, ‘প্রকৃতি এবং মানব জাতির স্রষ্টা এক জন। উভয়ের সৃষ্টি কর্তা এক হওয়ার অর্থ এই যে, মানব জাতি প্রকৃতি সুরক্ষার দায়িত্ব প্রাপ্ত। ইসলাম শুধুমাত্র মহা প্রলয়ের বার্তা দেয় না বরং এই ধর্ম একই সাথে আশা এবং ইতিবাচক দিক সমূহের কথা তুলে ধরে।’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিম গবেষক বৃন্ধ আল-জাইউসির মত করে চিন্তা করে থাকেন। ইব্রাহিম ওজদেমির এর মত করে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আখতার মাহমুদ, ইমাম খমেনী শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক মোহাম্মদ আলি সোমালি, কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুসতাফা আবু সওয়াই এবং জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইয়েদ হোসাইনের মত বিশ্বখ্যাত গবেষকগণ ইসলামে জলবায়ু সুরক্ষার বিষয়ে গবেষণা করে চলেছেন।
ইব্রাহিম ওজদেমির বলেন, ‘প্রকৃত সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা, সৌন্দর্য, প্রজ্ঞা এবং দয়া আয়নার মত করে প্রতিফলিত করে। প্রকৃতি কে সৃষ্টিকর্তার ভারসাম্যপূর্ণ সৃষ্টি হিসেবে ধরে নেয়া হয়।’
২০১৫ সালে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার নের্তৃবৃন্ধ তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে ‘Islamic Declaration on Global Climate Change’ শিরোনামে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং তারা সেখানে ‘বৈশ্বিক প্রকৃতি সুরক্ষার জন্য অতি সত্বর ব্যবস্থা’ নেয়ার আহ্বান জানান। ওই অনুষ্ঠানে বসনিয়া এবং উগান্ডার প্রধান মুফতি গণ অংশ গ্রহণ করেছিলেন।
আল-জাইউসি বলেন, ‘ইসলামিক প্রকৃতি আইন আইন বিজ্ঞানের এমন একটি মহান উদ্দেশ্যের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যার উদ্দেশ্য হচ্ছে পৃথিবীর জীব এবং মানবজাতির জন্য কল্যাণ করা।’
বাহরাইন, কুয়েত এবং ওমানের মত মুসলিম অধ্যুষিত দেশ সমূহ ইতোমধ্যেই জলবায়ু সুরক্ষায় তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে যাতে করে তারা ইসলামে নির্দেশিত প্রকৃত সুরক্ষার বিষয়ে গুরত্বারোপ করতে পারে।
ইব্রাহিম ওজদেমির বলেন, ‘প্রকৃতি বিজ্ঞান এবং সমসাময়িক বিজ্ঞানের বিষয়ে মুসলিম গবেষক এবং ইমামদের ক্ষমতায়ন করা জরুরি যাতে করে তার এসবের উপর যথা উপযুক্ত আলোচনা করতে পারেন।’
তিনি বলেন, ‘ধর্ম এবং সংস্কৃতির উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্বের উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশ সমূহে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন করা।’
বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম হিসেবে ইসলাম প্রকৃতি বিজ্ঞানের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখতে পারবে। বুদ্ধইজম, খ্রিস্টানিটি, হিন্দুইজম এবং জুড়াইজম ধর্মের মত অন্যান্য ধর্ম সমূহ ইসলামের মত করে জলবায়ু সুরক্ষার বিষয়ে গুরত্বারোপ করেছে।
আল-জাইউসি বলেন, ‘মুসলিম ইমামগণের এমন দক্ষতা অর্জন করা দরকার যাতে করে তারা সমাজে অপচয় রোধ এবং প্রকৃতি সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের বিষয়ে বার্তা পৌছিয়ে দিতে পারেন।’
তিনি বলেন, ‘ইসলাম প্রকৃতি আইন শিক্ষার সংস্কার এবং প্রসার করতে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ঙ্কর রূপ সম্পর্কে মধ্য প্রাচ্য এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশ সমূহের উচিত মুসলিম বিশ্বের সাথে সমন্বয় করে প্রকৃতি সুরক্ষার বিষয়ে এগিয়ে আসা।
ইব্রাহিম ওজদেমির বলেন, ‘প্রকৃতি সুরক্ষা এবং দীর্ঘ স্থায়ী উন্নয়নের জন্য মুসলিম দেশ সমূহের উচিত ইসলামিক শিক্ষা কে কাজে লাগানো একই সাথে ইসলামিক ঐতিহ্য ও চর্চার বিষয়ে ধর্মীয় বাণী সমূহের ব্যাপক প্রসার করা।’
তিনি বলেন, ‘মুসলিম রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় নের্তৃ বৃন্ধ পারষ্পারিক সহযোগিতার মাধ্যমে সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়ে নিজেদের ভূমিকার কথা পুনরায় চিন্তা করা উচিত।’