
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন পিয়ংইয়ং এ কিম জং উনের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের পর বুধবার বলেছেন, উত্তর কোরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সাইট টংচাং-রি বন্ধ করে দেবে। খবর এএফপি’র।
মুন সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সাইট টংচাং-রি ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সুবিধা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।’
পিয়ংইয়ংয়ে কিমের সঙ্গে এক শীর্ষ বৈঠক শেষে দুই নেতা কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার একটি পন্থায় একমত হয়েছেন।
কিম ও মুন পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। কিম চুক্তিটিকে, কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে একধাপ এগিয়ে যাওয়া হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি আরো জানান যে, তিনি অদূর ভবিষ্যতেই দক্ষিণ কোরিয়া সফর করতে পারেন। এমনটা হলে তিনিই হবেন দক্ষিণ কোরিয়া সফরকারী প্রথম উত্তর কোরীয় নেতা।
পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ছাড়াও দুই কোরীয়ার মধ্যে রেলওয়ে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও করছেন দুই নেতা। এতে করে কোরীয় যুদ্ধে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে সহজেই দেখা করতে পারবেন। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক সহযোগিতাও বৃদ্ধি পাবে।
পিয়ংইয়ংয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের পর মুন বলেন যে, কিম উত্তর কোরিয়ার তংচাং-রি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ স্থাপনা, সম্পর্কিত দেশের বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে, চিরতরে বন্ধ করে দিতে সম্মত হয়েছেন।
তিনি বলেন, টংচাং-রি’র পাশাপাশি কিম ইয়ংবিয়োন পারমাণবিক কেন্দ্রও বন্ধ করে দিতে সম্মত হয়েছেন। তবে এজন্যে যুক্তরাষ্ট্রকেও একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে হবে।
ট্রাম্প এবং কিম-এর মাঝে আটকা পড়েছেন যিনি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জন-আনকে আলোচনার টেবিলে বসানোর জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন মধ্যস্থতাকারীর কাজ করছেন।
এ আলোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমাণু কর্মসূচী থেকে উত্তর কোরিয়াকে বিরত রাখা। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট এখন উত্তর কোরিয়া সফরে আছেন।
গত এপ্রিল মাস থেকে এ পর্যন্ত তিনবার উত্তর কোরিয়ার নেতার সাথে বৈঠক করছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট। এ তৃতীয় বৈঠকটি অন্য দুবারের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।
পরমাণু অস্ত্র পরিত্যাগ করার জন্য উত্তর কোরিয়াকে বোঝানোর বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে আলোচনায় অগ্রগতি করতে হবে। সেটি না হলে দুই কোরিয়ার বৈঠক, ট্রাম্প এবং কিম-এর সাক্ষাৎ – এসব কিছুই শুধু ফটো-সেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
এক পর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার বিষয়ে ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলতে পারেন। নিজ দেশে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের পক্ষে জনসমর্থনে ভাটা পড়েছে।
এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হলে উত্তর কোরিয়ার সাথে আলোচনায় অগ্রগতি করতেই হবে। অগ্রগতির ক্ষেত্রে আসল প্রতিবন্ধকতা কোথায়? তার কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলো।
উত্তর কোরিয়াকে আরো বোঝাতে হবে গত জুন মাসে উত্তর কোরিয়ার নেতার সাথে সিঙ্গাপুরে বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার দিক থেকে এখন আর পরমাণু হামলার আশংকা নেই।
কিন্তু পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করেন, উত্তর কোরিয়া তাদের পরমাণু কর্মসূচী থেকে সড়ে আসবে না। উত্তর কোরিয়া এতো বছর ধরে তাদের পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এখন তারা সেখান থেকে সড়ে আসবে কেন? উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট এখন পর্যন্ত যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেটি খুবই অস্পষ্ট। এর পরিবর্তন করতে হবে।
গ্রিফিত এশিয়া ইন্সটিটিউটের আন্দ্রে আব্রাহামিয়ান বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, উত্তর কোরিয়াকে এ সপ্তাহে কিছু প্রতীকী কিংবা উল্লেখযোগ্য ছাড় দিতে হবে যাতে দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের আগ্রহ বজায় থাকে’।
‘মুন যদি আলোচনায় অগ্রগতি করতে পারে তাহলে দেশের ভেতরে তার অবস্থান শক্ত হবে এবং আমেরিকার উপর চাপ বজায় রাখতে পারবে যাতে তারা সামনে এগিয়ে যায়’।
উত্তর কোরিয়ার নেতার সাথে চলতি মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার যারা বৈঠক করেছিলেন, তাদের কাছে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে পরমাণু কর্মসূচী বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তার প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। ট্রাম্পকে আলোচনায় ধরে রাখা।
হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়া তাদের সর্বশেষ মিসাইল পরীক্ষা করেছিল ১০ মাস আগে। এটা এক ধরণের অগ্রগতি। কিন্তু স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে যে উত্তর কোরিয়া তাদের অস্ত্র মজুদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
জনসম্মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতার প্রশংসা করেছেন। ৯ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়ার সামরিক মহড়ায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শনী না করায় কিম জং আনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
জনসম্মুখে যাই বলুক না কেন, পরমাণু অস্ত্র বন্ধের বিষয়ে উত্তর কোরিয়ার আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন ট্রাম্প প্রশাসন।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট-এর প্রধান কাজ হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং কিম জং-আনকে আলোচনার টেবিলে আবার বসানোর জন্য আগ্রহ ধরে রাখা। উত্তর কোরিয়ার নেতার সাথে বৈঠকের পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন।
সেখানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে দেখা করবেন। আলোচনা যেখানে শুরু হয়েছিল, সেখানে কাজ করা
পিয়ংইয়ং এবং ওয়াশিংটন পরস্পরের সাথে ভিন্ন-ভিন্ন অবস্থান থেকে আলোচনা করছে। সেজন্য আলোচনা আটকে গেছে। উত্তর কোরিয়া চায় কোরিয়া যুদ্ধ শেষ করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। দক্ষিণ কোরিয়াও সেটাই চায়।
১৯৫৩ সালে যুদ্ধ শেষ হলেও কোন শান্তি চুক্তি হয়নি। এপ্রিল মাসে এক বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুদ্ধ শেষ করার জন্য আনুষ্ঠানিক অঙ্গিকার-নামা স্বাক্ষর করেছে।
কিন্তু সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিলনা। ওয়াশিংটন চায় কোন শান্তি চুক্তি করার আগে উত্তর কোরিয়া পরমাণু কর্মসূচী বন্ধ করুক। ব্যক্তিগত বোঝা বয়ে চলা
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন-এর পিতা-মাতা কোরিয়া যুদ্ধ চলার সময় উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে এসেছেন। সে সময় প্রায় এক লাখ মানুষ পালিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় এসেছিল। শরণার্থী ক্যাম্পে জন্ম হয়েছিল ভবিষ্যৎ দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের।
মুন জায়ে-ইন-এর পিতা-মাতা চান মৃত্যুর পর তাদের জন্মভূমি উত্তর কোরিয়ার মাটিতে তাদের দাফন করা হোক। বাবা-মায়ের এ আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার গুরু দায়িত্ব রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কাঁধে।
এক সময় তারা ভাবতেন যে কমিউনিস্ট উত্তর কোরিয়ার সাথে কথা বলা উচিত হবেনা কিংবা তাদের সাথে কথা বলা যায় না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে উত্তর কোরিয়া ধীরে-ধীরে পাল্টাচ্ছে বলে মনে করেন দক্ষিন কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বাবা।
কিন্তু উত্তর কোরিয়া সত্যিকার অর্থে বদলাবে কি না সেটি নিয়ে তার মনে দ্বিধা রয়েছে। তবে তার ছেলে অর্থাৎ দক্ষিন কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট অন্তত চেষ্টা করছেন।