
বাংলাদেশে গত পাঁচদিন ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের খবর ফলাও করে উঠে এসেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসি, ফরাসি বার্তা সংস্থা এজেন্সি ফ্রান্স প্রেস (এএফপি), কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা, চীনের সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আনন্দবাজারে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
এছাড়া এএফপি’র প্রতিবেদন থেকে তথ্য নিয়ে খবর ছাপিয়েছে মালয়েশিয়ার দ্য স্ট্রেইটস টাইমস ও ফিলিপাইনের সংবাদমাধ্যম র্যাপলার, পাকিস্তানের দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, কাতারের গালফ টাইমস, স্ট্রেইট টাইমস। এছাড়া ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম পার্স টুডের বাংলা সংস্করণ, জার্মানির ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণে ঢাকার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে একাধিক খবর প্রকাশিত হয়েছে।
শুক্রবার (৩ আগস্ট) এক ভিডিও প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিবিসি বলছে, বাসের রেষারেষিতে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হওয়ায় টানা পঞ্চম দিনের মতো ঢাকার রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে হাজার হাজার বাংলাদেশি স্কুল শিক্ষার্থী। নিরাপদ সড়কের দাবিতে এখনও তাদের এই আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে বিবিসি জানাচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ আইনের দ্রুত বাস্তবায়ন ও দোষীদের ত্বরিত শাস্তি নিশ্চিতের দাবি করছে তারা। ফিটনেস ও লাইসেন্সবিহীন যানবাহন চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারিরও দাবি তাদের। শিক্ষার্থীদের এসব দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তবে মন্ত্রীর এ ধরণের আশ্বাসও স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের টানা পঞ্চম দিনের মতো রাস্তায় নেমে আসা থামাতে পারেনি। এদিনও রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে যানবাহন ও চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের।
বিবিসি আরও জানাচ্ছে, কোথাও কোথাও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর চড়াও হয়েছে পুলিশ। আন্দোলন কর্মীরা বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় গত বছর প্রায় ৪ হাজার ২শ’ পথচারীর মৃত্যু হয়েছে।
এএফপি’র খবরে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে শিক্ষার্থী বিক্ষোভের পঞ্চম দিন চলছে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে হাজারো শিক্ষার্থী। ধারণা করা হচ্ছে, দুর্নীতি ও নিয়ন্ত্রণহীনতায় ভয়ংকরভাবে ভুগছে বাংলাদেশের পরিবহন খাত।
এএফপি আরও জানাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দুই শিক্ষার্থী নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে অন্যান্য শিক্ষার্থীরা। টানা বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে ঢাকা প্রায় অচল হয়ে পড়লে আন্দোলন পরিহার করতে শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ নিয়ে গত মঙ্গলবার (৩১ জুলাই) খবর প্রকাশ করেছে চীনের সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া। সেখানে বলা হয়েছে, বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের জেরে দোষীদের বিচারের দাবিতে টানা তিনদিনের মতো ঢাকার রাস্তা দখলে নিয়েছে শিক্ষার্থীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব শিক্ষার্থীদের নিভৃত করার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। রাস্তায় যানবাহন চলাচল কমে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন ঢাকাবাসী।
এক প্রতিবেদনে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে জানিয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে ঢাকার রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে শিক্ষার্থীরা। এতে সীমাহীন যানজট ও জন ভোগান্তির সৃষ্টি হলেও শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন অনেকেই।
পশ্চিমবঙ্গের সর্বাধিক পঠিত সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যস্ত রাজধানী ঢাকার অবাধ্য ট্রাফিক-ব্যবস্থাকে বশে আনতে রাস্তায় নেমেছে ইউনিফর্ম পরিহিত স্কুলছাত্ররা। উল্টো পথে আসায় মন্ত্রীর গাড়ি আটকে ঘুরিয়ে দিয়েছে তারা। পুলিশের গাড়ির লাইসেন্স না থাকায় সেটিকেও থামিয়ে দিয়েছে তারা।
বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতার কথাও উল্লেখ করে স্ট্রেইট টাইমস। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সড়কে নজরদারীর অভাব ভয়াবহ। গণপরিবহন প্রায়ই চালানো হয় অনভিজ্ঞ, লাইসেন্সবিহীন ও অল্পবয়সী চালক দ্বারা। একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে ৪ হাজার ২০০ জন পথচারীর মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। যা ২০১৬ সালের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি।
পত্রিকাটির খবরে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের বিতর্কিত মন্তব্যে সমালোচনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, সামাজিকমাধ্যমে অনেকেই তার পদত্যাগ দাবি করছেন। এছাড়া বৃষ্টির দিনে অনেক যাত্রীকে হেঁটে গন্তব্যে যেতে হলেও অনেকেই এই আন্দোলনে সমর্থন জানাচ্ছেন বলে লিখেছে পত্রিকাটি। রশিদুর রহমান নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তার বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। তিনি বলেন, বড়দের যা করা উচিত ছিল তা করছে শিক্ষার্থীরা। এই বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে তারা।
উল্লেখ্য, গত রোববার (২৯ জুলাই) কুর্মিটোলায় জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে প্রাণ হারায় শহীদ রমিজউদ্দিন স্কুলের দুই শিক্ষার্থী আব্দুল করিম ও দিয়া খান মিম। এরপর থেকে, টানা পাঁচ দিন ধরে ঢাকার পথঘাট দখল করে রাখে বিক্ষোভে ফেটে পড়া শিক্ষার্থীরা। ওদের এক দাবি, সড়ক নিরাপদ করো, সড়কে হত্যার বিচার করো। সেই দাবিতে নিজেরাই নেমে গেছে পথে। গাড়ি ধরে ধরে যাচাই করছে। কারা লাইসেন্স ছাড়া পথে নেমেছে? কে ট্রাফিক আইন ভেঙেছে? ওদের এই চেকিং থেকে বাদ পড়েননি বিচারপতি, মন্ত্রী, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।