
উত্তেজনা-শঙ্কার মধ্যেই রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে ভোটযুদ্ধ আজ। সব ধরনের প্রস্তুতি এরই মধ্যে সেরে ফেলেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সকাল ৮টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হচ্ছে। ভোটের মাঠের দায়িত্ব শনিবার সকাল থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। নেয়া হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তা। তবে শেষ মুহূর্তেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। সেই সঙ্গে উত্তেজনা বিরাজ করছে তিন সিটিতেই।
রবিবার রাতেই নির্বাচনের সামগ্রী প্রিসাইডিং অফিসার এবং কেন্দ্র পাহারায় থাকা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং সেগুলো সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে পৌছেঁ বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টরা। রিটার্নিং অফিসারের নির্বাচনের ফল প্রকাশ করা সমন্বয় কেন্দ্র থেকে এসব সামগ্রীও হস্তান্তর করা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে মেয়র পদে বেশ কয়েকটি দল অংশ নিলেও মূলত নৌকা-ধানের শীষের লড়াই হবে। প্রধান দু’দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে শঙ্কাও কম নয়। এখন দেখার বিষয় আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নিরপেক্ষ থেকে কিভাবে নির্বাচনের বৈতরণী পার করে সাংবিধানিক এই সংস্থাটি।
এদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ভোটের আগের দিনও নানা অভিযোগ করেছেন। এর মধ্যে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ বরিশালে বহিরাগত এনেছে। আওয়ামী লীগ বিভিন্ন জেলা, উপজেলা থেকে লোক নিয়ে এসেছে। এসব লোকজন ভোটের দিন লাইনে দাঁড়িয়ে সিল মারবে। অথচ বিএনপির নেতা-কর্মীদের হোটেল থেকে চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মেয়র-প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ নির্বাচনি আ্চরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে তাকে শোকজ করেছে নির্বাচন কমিশন। তিনি কোনো ইশতেহার ঘোষণা করেননি। তিনি বলেন, ‘ইশতেহার দিয়ে নাগরিকদের সাথে প্রতারণা করতে চাইনা। নাগরিকদের চাওয়া পাওয়া পূরণ করার চেষ্টা করবো। আমি চাই ভোটাররা উৎফুল্ল মনে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে সোমবার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।’
এদিকে রাজশাহী সিটি নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন আমাদের অব্যাহত থাকবে। এ নির্বাচন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনকে আরও তীব্র করবে। সোমবার আমরা কাফনের কাপড় মাথা দিয়ে ভোট যুদ্ধে যাব।’
২৩-২৪ জন পোলিং এজেন্টকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অভিযোগ করে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, ‘গত রাতে পোলিং এজেন্টের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট কেন্দ্রে যাতে না যায়, এমনকি শহর ছেড়ে চলে যেতে হুমকি দেয়া হয়েছে। যদি কথা না শুনে তা হলে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়া হয়।’
এছাড়া বুলবুল নির্বাচন কমিশনে লিখিত চারটি অভিযোগ দেন। এগুলো হলো, পোলিং এজেন্টসহ ৩০/৩২ জন বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, সাদা পোষাকের পুলিশ নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিয়ে ভোট কেন্দ্রে না যেতে নিষেধ করা, ধানের শীষের প্রতীকের অফিসে অবস্থান করলে গ্রেপ্তারের হুমকি এবং প্রিজাইডিং অফিসারের তালিকা না দেয়া।
তবে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন মন্তব্য করেছেন নির্বাচনে পরাজয় নিশ্চিত জেনেই বিএনপি নানা অপপ্রচারের অপকৌশল গ্রহণ করেছে।
খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘তারা এখন বলে বেড়াচ্ছেন, আমরা নাকি ভোটের আগেই বাক্স ভর্তি করে রাখব। সেটাই যদি হয়, তবে ভোট করছে কেন? অভিযোগ নিয়ে কোর্টে যাচ্ছে না কেন?’
এদিকে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ উঠেছে। জামায়াতের এক নেতা অভিযোগ করে বলেন, রবিবার সন্ধ্যা ৬টা ৫৯ মিনিটে Etyhasher Diner নামের একটি আইডি থেকে ফেসবুকে সিলেটভিউর লোগো এবং দুই মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী ও এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের ছবি ব্যবহার করে একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছে। এতে লেখা হয়েছে ‘অবশেষে ২০ দলীয় জোট প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীকে জামায়াত প্রার্থীর সমর্থন’।
এ ব্যপারে সিলেটভিউ কর্তৃপক্ষও এটিকে অপপ্রচার দাবি করে বলেছেন- আমাদের লোগো ব্যবহার করে ফেসবুকে অপপ্রচার করা হয়েছে। এধরনের কোন সংবাদ সিলেটভিউ প্রকাশ করেনি বা এধরনের সংবাদের কোনো সত্যতাও নেই। বিষয়টি ইতোমধ্যেই পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে সিলেটে দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা ও ভয়ভীতি না দেখিয়ে– সিটি নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার দাবি বিএনপি’র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। আর আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের যুক্তি, বিএনপি জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি বলেই এসব অভিযোগ করছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি নির্বাচনের প্রচারণা শনিবার মধ্যরাত থেকেই শেষ হয়েছে। সিটি নির্বাচনের আচরণ বিধি অনুযায়ী ভোটগ্রহণ শুরুর ৩২ ঘণ্টা আগে এ প্রচারণা শেষ হয়। তাই সিটির মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা শনিবার মধ্যরাতের পর আর কোনো ধরনের প্রচারণা চালাতে পারবেন না। সোমবার ভোট, এর আগের দিন নিজস্ব বলয়ে নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে সাক্ষাতে প্রার্থীদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকে।
ইসি সূত্র আরো জানায়, তিন সিটি এলাকার মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে নিরাপত্তা তল্লাশি। কমিশনের অনুমোদিত স্টিকার ছাড়া মোটরসাইকেল চলাচলেও আরোপ হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ভোটার ছাড়া সব ধরনের বহিরাগতদের এলাকা ছাড়তে আগেই পরিপত্র জারি করেছে কমিশন। ভোটের দিন প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট কার্যক্রমের গতি-প্রকৃতি, ভোটার, প্রার্থী-কর্মী সমর্থকদের গতিবিধি এবং সর্বোপরি নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনসহ সবকিছু সাধারণ পোশাকে পর্যবেক্ষণ করবেন ইসির নীরব পর্যবেক্ষকরা। ভোটে অনিয়ম দেখলে তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ, রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবহিত এবং প্রয়োজনে কমিশনকে ঘটনার তথ্য সম্পর্কে জানাবেন তারা।
নির্বাচন আয়োজন নিয়ে রাজশাহীর রিটার্নিং কর্মকর্তা সৈয়দ আমিরুল ইসলাম বলেন, এই সিটিতে ৩০ ওয়ার্ডের ১৩৮ ভোটকেন্দ্রে কক্ষের সংখ্যা ১০২৬টি। এসব ভোটকেন্দ্রে ১৩৮ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ১০২৬ কক্ষে সমসংখ্যক সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং কক্ষে দু’জন করে ২০৫২ জন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে সাধারণ ওয়ার্ডে পুলিশের নেতৃত্বে আনসারসহ ২২ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪ জন সাধারণ নিরাপত্তারক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন। আর পুলিশ, আর্মস পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও ব্যাটালিয়ন আনসারের সমন্বয়ে মোবাইল ফোর্স ৩০ জন ও স্ট্রাইকিং ফোর্স ১০ জন, প্রতিটি ওয়ার্ডে র্যাবের একটি করে (৩০) টিম এবং প্রতি দুই ওয়ার্ডে বিজিবির ১ প্লাটুন অর্থাৎ ১৫ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন থাকছে। রাজশাহী সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৮ হাজার ১৩৮ জন; যার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫ জন ও নারী ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৩ জন। তবে পুরুষের চেয়ে এখানে নারী ভোটার বেশি।
বরিশালের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান বলেন, এ সিটির ৩০ ওয়ার্ডে ১২৩ ভোটকেন্দ্রে কক্ষের সংখ্যা ৭৫০টি। এসব ভোটকেন্দ্রে ১২৩ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ৭৫০ কক্ষে সমসংখ্যক সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং কক্ষে দু’জন করে ১৫০০ জন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করছেন। সাধারণ ওয়ার্ডে পুলিশের নেতৃত্বে আনসারসহ ২২ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪ জন সাধারণ নিরাপত্তারক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন। আর পুলিশ, আর্মস পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও ব্যাটালিয়ন আনসারের সমন্বয়ে মোবাইল ফোর্স ৩০ জন ও স্ট্রাইকিং ফোর্স ১০ জন, প্রতিটি ওয়ার্ডে র্যাবের একটি করে (৩০) টিম এবং প্রতি দুই ওয়ার্ডে বিজিবির ১ প্লাটুন অর্থাৎ ১৫ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন থাকছে। বরিশাল সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪২ হাজার ১৬৬ জন; যার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ২১ হাজার ৪৩৬ জন ও নারী ১ লাখ ২০ হাজার ৭৩০ জন। তবে এ সিটিতে পুরুষ ভোটার বেশি।
এদিকে সিলেটের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলীমুজ্জামান জানিয়েছেন, এ সিটির ২৭ ওয়ার্ডে ১৩৪ ভোটকেন্দ্রে কক্ষের সংখ্যা ৯২৬টি। এসব ভোটকেন্দ্রে ১৩৪ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ৯২৬ কক্ষে সমসংখ্যক সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং কক্ষে দু’জন করে ১৮৫৪ জন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করছেন। সাধারণ ওয়ার্ডে পুলিশের নেতৃত্বে আনসারসহ ২২ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪ জন সাধারণ নিরাপত্তারক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন। আর পুলিশ, আর্মস পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও ব্যাটালিয়ন আনসারের সমন্বয়ে মোবাইল ফোর্স ২৭ জন ও স্ট্রাইকিং ফোর্স ১০ জন, প্রতিটি ওয়ার্ডে র্যাবের একটি করে (২৭) টিম এবং প্রতি দুই ওয়ার্ডে বিজিবির ১ প্লাটুন অর্থাৎ ১৪ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন থাকছে। এ সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ জন; যার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৪৪ জন ও নারী ১ লাখ ৫০ হাজার ২৮৮ জন। এ সিটিতেও পুরুষ ভোটার বেশি।
নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে কমিশন সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, কমিশনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এরইমধ্যে মাঠে নেমেছেন। আশা করছি, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই এই তিন সিটির ভোট শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে।
প্রসঙ্গত, ৩০ জুলাই তিন সিটিতে ১৮ জন মেয়র প্রার্থী লড়ছেন। এর মধ্যে রাজশাহীতে ৫ জন, বরিশালে ৬ জন এবং সিলেট সিটিতে ৭ জন। তবে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। প্রচার এবং আলোচনায় সরকার সমর্থিত মেয়র এবং সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি প্রার্থীরা। তবে, তিন সিটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী লড়ছেন ৫ জন।