
পাকিস্তান পৃথিবীর ৩য় বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের মালিক হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হঠাৎ আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো বলছে, নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের কে বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারে পরিণত করার পথে রয়েছে পাকিস্তান। মিলিটারি ডট কমে লেখা একটি প্রতিবেদনে এমন কথা বলেছেন সামরিক বিশেষজ্ঞ জোসেফ জোসেফ ভি মিকালেফ।
প্রতিবেদনটিতে মিকালেফ পাকিস্তানের উচ্চভিলাসী পারমাণবিক পরিকল্পনার ব্যাপারে সাবধান করেছেন। তিনি মনে করেন, ইসলামাবাদ এরকম কার্যক্রম চালাতে থাকলে এ সকল পারমাণবিক অস্ত্র জিহাদীদের হাতে পড়তে পারে। যা পাকিস্তান এবং পুরো বিশ্বের জন্যই খারাপ হবে।
মিকালেফ লিখেছেন, ‘আগে থেকেই পাকিস্তানের সাথে তালেবান, তেহরিক-ই-জিহাদ ইসলামী, জইশ-ই-মোম্মদের মতো জঙ্গি গ্রুপগুলোর সু-সম্পর্ক রয়েছে। এর মধ্যে যোগ হয়েছে আল কায়েদার মদদপুষ্ট সংগঠন আনসার ঘাওজাত-আল-হিন্দ। যা ভারত পাকিস্তান দ্বন্দ্বকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, এই সম্পর্কগুলো পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককেও ক্ষতিগ্রস্থ করেছে।
প্রতিবেদনটিতে দেয়া তথ্যানুসারে ১৯৭১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে পাকিস্তান নিজের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধকরণে সর্বোচ্চ শক্তি বিনিয়োগ করেছে। পাকিস্তানে মোট ৪টি প্লুটোনিয়াম উৎপাদন রিঅ্যাক্টর এবং ৩টি প্লুটোনিয়াম বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট রয়েছে। পাকিস্তানের প্লুটোনিয়াম এবং ইউরেনিয়াম উভয় ভিত্তিক অস্ত্র রয়েছে। গ্যাস কেন্দ্রীক সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পাকিস্তান অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন করছে।
আরো পড়ুন….
পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানিতে পররাষ্ট্র নীতির প্রতিফলন
যখন কোন দেশের পররাষ্ট্র নীতিতে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু, বিশ্ব ব্যবস্থায় তাদের অবস্থান, তাদের স্বার্থের জায়গাগুলো বোঝার প্রয়োজন হয়, তখন একটা উপায় হলো দেখা যে কাদের থেকে অস্ত্রের চাহিদা মেটাচ্ছে তারা। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যমত মিত্র ছিল পাকিস্তান। তখন যুক্তরাষ্ট্র শুধু যে পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করতে তা নয়, বরং পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতারা যুক্তরাষ্ট্রে যেতো প্রশিক্ষণের জন্য। চীনের কোন অবস্থান ছিল না তখন।
৬৫ বছরের ইতিহাসে, সাময়িক উত্থান-পতনের মধ্যেও পাকিস্তান বরাবর মার্কিন অস্ত্রের অন্যতম প্রধান আমদানিকারক ছিল। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় এই ধারা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর চলমান বৈশ্বিক ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ পর পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের ‘নন-ন্যাটো’ মিত্র হিসেবে পরিচিত হয়। পাকিস্তান এ সময়টাতে সব দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিল।
কিন্তু এ অবস্থাটা ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। একটি কারণ যেটা আমরা বুঝতে পারি সেটা হলো আফগানিস্তান নিয়ে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতির মধ্যে ব্যাপক মতভেদ। কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ নয়। এশিয়ায় চীনের উত্থানে পাকিস্তান তার সম্পর্কের মধ্যে আরও বৈচিত্র নিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের উপর থেকে তাদের নির্ভরশীলতাও কমেছে।
যদিও পাকিস্তানের অনেকেই এ প্রশ্ন করে যাচ্ছেন যে কিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনের উপর নির্ভরতা বাড়ালে তাতে অর্থপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। একটা বিষয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই যে পাকিস্তানের সাথে চীনের সম্পর্কের একটা ভূ-অর্থনৈতিক মাত্রা আছে যেটা পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ছিল না। তাছাড়া পাকিস্তান চীনকে প্রতিবেশী পরাশক্তি হিসেবে দেখে না। বরং পূর্ব ও পশ্চিমের প্রতিবেশী সীমান্ত থেকে যে সব হুমকির মোকাবেলা করতে হচ্ছে তাদের, সেগুলোর মোকাবেলায় চীনের সাথে সম্পর্ককে একটা সুযোগ হিসেবে দেখছে। একই সাথে ১৭ বছরের আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে যে ‘আরও করার’ জন্য বলছে, সেগুলোর বিপরীতেও একটা ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।
পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানির পরিমাণও ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। একই সাথে পাকিস্তান-চীন সুসম্পর্কের কারণে পাকিস্তানে চীনের অস্ত্র রফতানির পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে।
এসআইপিআইআই সম্প্রতি এক রিপোর্টে বিষয়টি উল্লেখ করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে:
“২০০৮-১২ এবং ২০১৩-১৭ সময়কালে পাকিস্তানে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রফতানি করেছে চীন। উভয় সময়কালেই যদিও পাকিস্তানে চীনের রফতানি করা অস্ত্রের পরিমান প্রায় কাছাকাছি ছিল, কিন্তু পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানি হ্রাসের কথা বিবেচনা করে ২০০৮-১২ সময়কালে পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানির ৪৫ শতাংশ এসেছে চীন থেকে আর ২০১৩-১৭ সময়কালে এ পরিমাণ ছিল ৭০ শতাংশ।
পাকিস্তানে চীনের অস্ত্র রফতানির বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্কের অবনতি, যেটা রিপোর্টেও উঠে এসেছে:
“২০০৮-১২ সালে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র থেকে যথেষ্ট সামরিক সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৮টি কমব্যাট জঙ্গিবিমান এবং পাঁচটি জলসীমায় টহল দেয়ার উপযোগী আকাশযান। ২০১৩-১৭ সাল সময়কালে (তালেবানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাকিস্তান যথেষ্ট দায়বদ্ধ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের এই ধারণার কারণে) দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক সহায়তা কমিয়ে দেয় এবং পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র আমদানির পরিমাণ ২০০৮-১২ সালের তুলনায় ৭৬ শতাংশ কমে যায়।”
পাকিস্তানে চীনের তৈরি অস্ত্র আমদানির পরিমাণ বিপুল পরিমাণে বেড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ রয়েছে। চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য পাকিস্তানের যে সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা, সেটা দেখে বোঝা যায় যে ভারত-চীন বৈরি সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে চীনের সাথে সম্পর্ককে এগিয়ে নিচ্ছে পাকিস্তান।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে যে, ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আমদানিকারক। বিশ্বের মোট অস্ত্র আমদানির ১২ শতাংশই করছে ভারত। ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের অস্ত্র রফতানির ব্যাপারে প্রাধান্য বিস্তার করে ছিলো রাশিয়া, কিন্তু এ ধারাটাও এখন বদলে গেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে,
“২০০৮-১২ এবং ২০১৩-১৭ সময়কালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের অস্ত্র আমদানির পরিমাণ ৫৫৭ শতাংশ বেড়েছে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে। এই উন্নয়ন দুই দেশের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্বের অংশ এবং এ সম্পর্কের অধীনেই ভারতকে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।”
উল্লেখিত সময়ে, যে সব অস্ত্র ভারত আমদানি করেছে, সেগুলোর মধ্যে শুধু যে ছোট অস্ত্র রয়েছে তা নয়, বরং এর মধ্যে দীর্ঘপাল্লার নৌ টহল আকাশযান, কৌশলগত পরিবহন আকাশযান এবং এমনকি কমব্যাট হেলিকপ্টারও রয়েছে।
এশিয়ায় চীনের মোকাবেলায় ভারতকে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্রাদি দিয়েছে। ২০১৭ সালে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাত্র এক দশকেই ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র রফতানির পরিমাণ শূন্য থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীনের দিকে পাকিস্তানের ঝুঁকে পড়ার তাই শক্তি কৌশলগত কারণ রয়েছে, যেটা আফগানিস্তানেও আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হচ্ছে, যেখানে রাশিয়া ও ইরান ছাড়াও এই দুই দেশেরই স্বার্থ রয়েছে। তালেবানদের সাথে শান্তি প্রক্রিয়ার নিশ্চয়ই একটা প্রতিদান পাওয়া যাবে এবং ১৭ বছরের যুদ্ধের এতে ইতি ঘটবে। তবে আফগানিস্তানে যতদিন তালেবানদের ভাষায় ‘বিদেশী দখলদারিত্ব’ থাকবে, ততদিন হয়তো যুদ্ধের ইতি ঘটবে না।
পাকিস্তানের নীতি নির্ধারণে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিকে যে চীনমুখী ধারা দেখা যাচ্ছে, সেটা আরেকটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এবং অনেকটাই গ্রহণযোগ্য ধারণার সাথেও মিলে যায়। সেটা হলো চীন বিশ্বে আরও শক্তিশালী হওয়ার সাথে সাথে বিশেষ করে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের আধিপত্য ভেঙ্গে পড়বে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের মতো দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গড়তে বাধ্য হবে, কিন্তু সেখানেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতার পরিমাণ চীনের উত্থানের তুলনায় হবে অতি সামান্য।
এই পরিবর্তনশীল ধারা থেকে আরও যেটা দেখা যাচ্ছে, সেটা হলো ছোট দেশগুলোও বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পড়ে গেছে এবং এর থেকে সুবিধাও নিচ্ছে তারা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের স্বার্থ, উদ্দেশ্য ও কৌশল মেপে চলছে ছোট দেশগুলো।
পাকিস্তান সেই বিবেচনাতেও কোন ব্যাতিক্রম নয়। তারা পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে চলছে মাত্র। (কলামিস্ট- সালমান রাফি)