
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের নেতাদের কাছ থেকে শুক্রবার একটি উষ্ণ অভ্যর্থনা উপভোগ করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে।
অন্যদিকে, উদ্বিগ্ন চীনা নাগরিকরা আদর করে তার নাম দিয়েছেন ‘আন্টি মে’ এবং বেইজিংয়ের প্রচণ্ড ঠান্ডায় তার পা যথেষ্ট উষ্ণ হয়েছিল কিনা- তা নিয়ে তারা বেশ চিন্তিত ছিল।
ব্রিটিশ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের উদ্ধৃতি দিয়ে মে’র সঙ্গে একান্ত বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, ‘অতীত হচ্ছে পারম্ভের সূচনা।’
শি জিনপিং এই উদ্ধৃতির মাধ্যমে প্রকান্তরে সম্পর্ক শক্তিশালী করার জন্য তার প্রত্যাশার একটি ইঙ্গিত।
তিন দিনের বাণিজ্য সফরে চীনের পক্ষ থেকে মে’কে এই প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে যে, ব্রেক্সিট তথাকথিত ‘সুবর্ণ যুগের’ সম্পর্কের জন্য ব্রিটেনের দেশটির প্রভাবিত করবে না এবং নতুন ব্রিটিশ ব্যবসায়ের জন্য চীনা বাজার উন্মুক্ত করা হবে।
কথার সঙ্গে কর্মের সামঞ্জস্য না থাকলে এসব প্রতিশ্রুতির অর্থ নেহায়েত সামান্য এবং সফরের সময় স্বাক্ষরিত ৯ বিলিয়ন পাউন্ডের বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা সম্পর্কে সেখানে খুব বেশি তথ্য নেই।
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের ডাক নাম উল্লেখ করে চীনা আঞ্চলিক সংবাদপত্র ‘হুবেই ডেইলি’র সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ‘ব্রিটেনের আয়রন লেডির মতো রাজনৈতিক শৈলী হচ্ছে অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও দৃঢ় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় অত্যন্ত কুশলী।’

২০১৬ সালের দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক বিতর্ক দেখা দিয়েছিল।
মূল ব্রিটিশ অবকাঠামোতে বৈদেশিক বিনিয়োগের বিষয়ে চীনের অর্থায়নে পৃথক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বিলম্বিত করার মে’র সিদ্ধান্তের ফলে দুই দেশের মধ্যে এই কূটনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।
চীনা ‘গ্লোবাল টাইমস’ ট্যাবলয়েড বলছে, ‘চীন সত্যিই ব্রিটেনকে সম্মান করে।’
একই পত্রিকাটি ২০১৩ সালে মে’র পূর্বসূরি ডেভিড ক্যামেরনের সফরের সময় তার কঠোর সম্পাদকীয়তে ব্রিটেনকে কেবল ‘ভ্রমণ ও অধ্যয়নের’ জন্য উপযুক্ত পুরনো ইউরোপীয় দেশ বলে অবজ্ঞা করেছিল। ওই সময়ে দালাই লামার সঙ্গে ক্যামেরনের সাক্ষাৎ চীনকে উদ্বিগ্ন করেছিল।
উত্তেজিত চীনা একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছিলেন, ‘কেউই তাকে ‘আঙ্কেল ক্যামেরন’ বলে ডাকবেন না।’
তার নতুন নাম সম্পর্কে চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে মে বলেছেন, এর মাধ্যমে তাকে সম্মানিত করা হয়েছে এবং এতে তার কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে আনন্দিত হয়েছেন।
বিপরীতভাবে চলতি সপ্তাহে ব্রিটিশ রাজনৈতিক পত্রিকা ‘স্পেক্টেটর’ এর প্রথম পাতায় বলা হয়, ‘অদম্য গতিতে এগিয়ে যান।’ এতে মে’কে নিয়ে অপ্রীতিকর কার্টুন ছাপা হয়েছে।
কিন্তু চীনকে অনুনয় করা ব্রিটেনই একমাত্র রাষ্ট্র নয়। গত মাসে ফ্রান্সের উদ্যমী তরুণ প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও বেইজিং গিয়ে প্রকাশ্যে চীনের তোষামোদ করেছে। যদিও ট্রিলিয়ন ডলারের আধুনিক ‘সিল্ক রোড’ নির্মাণ নিয়ে শি’র স্বাক্ষর পরিকল্পনায় ম্যাক্রোঁর কঠিন শব্দগুলো ছিল ভ্রু কুঁচকানোর মতো।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে যে চীন ব্রেক্সিট সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও দেশটিকে ব্রিটেনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে ব্রিটেনের দরজা চীনের বিনিয়োগের জন্য ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত আছে।
মানবাধিকার ও ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের বিষয়ে শি’র নৈতিক উদ্বেগ, হংকংয়ের গণতন্ত্রের মতো বিব্রতকর ইস্যুগুলো মে এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু এসব ইস্যু নিয়ে প্রকাশ্যে চাপ সৃষ্টি না করার জন্য চীনের ‘গ্লোবাল টাইমস’ এটিকে ‘বাস্তবমুখী’ বলে প্রশংসা করেছে।
পত্রিকাটি শুক্রবার তার সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ‘সফরের বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশের কারণে মে ব্রিটিশ মিডিয়াকে শান্ত করতে পারলে তা প্রধানমন্ত্রীর জন্য সুখকর হবে।’
রয়টার্স অবলম্বনে