
নিখোঁজ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ড. মুবাশ্বার হাসান সিজার ফিরে এসেছেন। বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন খিলগাঁও থানার ওসি আব্দুল জলিল।
বৃহস্পতিবার (২১ ডিসেম্বর) রাত ১টার দিকে রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রীর জে ব্লকের ১২/৩ সড়কের বাসা ২৫ নম্বরের নিজ বাসায় ফিরে এসেছেন। বিষয়টি শুক্রবার (২২ ডিসেম্বর) সকালে সিজারের বাবা মোতাহের হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, সিজার বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে দক্ষিণ বনশ্রীর বাসায় ফিরেন।
এছাড়া সিজারের বোন তামান্না তাসনিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে জানিয়েছেন, ‘আল্লাহতায়ালার অশেষ রহমতে গতকাল দিবাগত রাত ১টায় আমার ভাইয়া সুস্থ অবস্থায় বাসায় ফিরেছে!’
তবে সিজার কীভাবে ফিরেছেন, কারা তাকে নামিয়ে দিয়ে গেছেন, এত দিন কোথায় ছিলেন—এ ব্যাপারে এখনো কিছুই জানা যায়নি।
প্রথমেই মোতাহের হোসেন জানিয়েছেন, ‘সাংবাদিক উৎপল দাস যেভাবে ফিরে এসেছেন ঠিক একইভাবে সিজার ফিরেছেন।’
পরবর্তীতে মুবাশ্বারের বাবা মোতাহার হোসেন জানান, ‘বৃহস্পতিবার রাতে কে বা কারা মুবাশ্বারকে রাজধানীর বিমান বন্দর এলাকায় নামিয়ে দিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে একটি সিএনজি নিয়ে বাসায় পৌঁছেছেন তিনি। মোবাশ্বারকে কে বা কারা, কোথায় নিয়ে গিয়েছিলো সে ব্যাপারে কিছু বলেনি।’
তিনি আরো জানান, ‘রাত ১টার দিকে বাসায় ফোন দেয় মুবাশ্বার। সে জানায়, তার কাছে টাকা নেই। সিএনজি নিয়ে বাসায় ফিরছে। তাই টাকা নিয়ে বাসায় নিচে থাকতে বলে। এরপর সিএনজি ভাড়া নিয়ে নিচে যাই আমরা।’
মুবাশ্বারের বরাত দিয়ে তার বাবা জানান, ‘কে বা কারা যেন তাকে এয়ারপোর্ট এলাকায় নামিয়ে দিয়ে গেছে। তাকে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি টান দিয়ে চলে যায় তারা। এরপর সিএনজি নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিয়ে ফোন করে সে।’
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মোবাশ্বার হাসানকে গত মঙ্গলবার বিকেল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মোবাশ্বার হাসান তার পরিচিতজনদের কাছে সিজার নামে পরিচিত। গত এক বছর যাবত বেসরকারি নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিটিক্যাল সায়েন্স এন্ড সোশিওলজি ডিপার্টমেন্টে শিক্ষকতা করছিলেন মোবাশ্বার হাসান।
২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে তিনি স্নাতকোত্তর পাশ করেন। সে সময় তিনি বছর খানেক ঢাকায় সাংবাদিকতা করেছেন। এরপর তিনি ব্রিটেনের ডান্ডি ইউনির্ভাসিটি থেকে রাজনীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। কয়েক বছর ব্রিটেনে অবস্থানের পর হাসান ঢাকায় ফিরে আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফামে যোগদান করেন।বছর দেড়েক সেখানে কাজ করার পর অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান এবং সেখানে গ্রিফিথ ইউনির্ভাসিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব কতটা ভূমিকা রাখছে সেটি ছিল তার পিএইচডি থিসিসের বিষয়বস্তু। অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে ফিরে হাসান ঢাকার বেসরকারি ইউল্যাব ইউনিভার্সিটিতে মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষকতা করেন। প্রায় দুই বছর সেখানে কাজ করার পর তিনি নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন।
ইসলাম, রাজনীতি এবং জঙ্গিবাদ বিষয়ে সম্প্রতি তিনি দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং জার্নালে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লি-ভিত্তিক একটি জার্নালে তার প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। বিশ্বায়নের ছায়ায় বাংলাদেশের ভেতরে কিভাবে রাজনৈতিক ইসলাম এবং উগ্রবাদী সহিংসতা ছড়াচ্ছে সে বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন তিনি সর্বশেষ লেখায়।
সাম্প্রতিক সময়ে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন মোবাশ্বার হাসান। সেজন্য বাসার সামনে ক্লোস সার্কিট ক্যামেরাও স্থাপন করেছিলেন তিনি।
কিছুদিন আগে তার বাসায় একজন অপরিচিত ব্যক্তি এসে তার খোঁজ করেছিলেন বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। মোবাশ্বার হাসানের ফেসবুক পাতায় ৩১শে অক্টোবরের এক পোস্টে দেখা যাচ্ছে তিনি লিখেছেন এক-দুই বছর ধরে তিনি বেনামী ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে বিরক্তিকর বার্তা পেয়ে আসছেন।
মোবাশ্বার হাসান এমন এক সময়ে নিখোঁজ হলেন যখন বাংলাদেশে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। এদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছে। এদের কেউ ফিরে এসেছেন এবং অনেকের কোন খোঁজ মেলেনি।
কয়েকমাস আগে লেখক ফরহাদ মাযহার ভোরে নিখোঁজ হয়ে যাবার পর রাতে তার সন্ধান মেলে।
মোবাশ্বার হাসান নিখোঁজ হবার পর খিলগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তার বাবা মোতাহার হোসেন। খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন তার বাবা পুলিশকে জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল সাতটায় মি. হাসান তার কর্মস্থল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে যান।
সেখানে ক্লাস শেষ করার পর দুপুরে আইডিবি ভবনে একটা মিটিং ছিল বলে জানা গেছে। হাসানের বাবা পুলিশকে জানিয়েছেন মঙ্গলবার দুপুর তিনটায় একবার এবং ৪টায় আরেকবার ফোন করেন তিনি।
এরপর থেকেই তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তার বাবা মোতাহার হোসেন বলেন, তারা নিজেরাও ধারণা করতে পারছেন না বিষয়টা কী হচ্ছে। এর বেশি কিছু তিনি বলেন নি। পুলিশ বলছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তদন্ত করা হচ্ছে।