সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই নয়—এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কণ্ঠ, নতুন আকাঙ্ক্ষা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলিত মানুষের নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি)-র উত্থান যেন রাজনীতির আকাশে এক নতুন সূর্যোদয়। পুরোনো, পরীক্ষিত কিন্তু ক্লান্ত রাজনৈতিক দলগুলোর ভিড়ে এই নতুন দলটি দাঁড়িয়ে গেছে এক ভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে—বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে একই ছায়ার নিচে এনে তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যয়ে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু প্রশ্ন নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে নানা সরকার এসেছে, নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—হিন্দু সম্প্রদায় আজও নিরাপত্তাহীনতা, ভূমি দখল, সামাজিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে উপেক্ষার ভার বয়ে চলেছে। নির্বাচনের সময় বড় দলগুলো সংখ্যালঘুদের কথা বলে, সহানুভূতির ভাষা শোনায়, কিন্তু ভোটের পর সেই ভাষা অনেক সময়ই হারিয়ে যায় ক্ষমতার কোলাহলে। ফলে বছরের পর বছর ধরে জমেছে বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস, অনিশ্চয়তার চাপা ক্ষোভ।
এই জায়গাটিতেই বিএমজেপির রাজনীতিতে আগমন এক ভিন্ন বার্তা দেয়। দলটি যেন স্পষ্ট করেই বলতে চায়—“আর নয় শুধু আশ্বাস, এবার প্রয়োজন নিজের কণ্ঠ, নিজের রাজনৈতিক শক্তি।” তারা বিশ্বাস করে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার টেকসইভাবে সুরক্ষিত হয় না। তাই বিএমজেপি কেবল একটি দল নয়, এটি এক ধরনের রাজনৈতিক আত্মজাগরণের প্রতীক।
এই লড়াইয়ের এক অনন্য মুখ কমলাকান্ত রায়—ঠাকুরগাঁও জেলা বিএমজেপির সাধারণ সম্পাদক এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী। তাঁর প্রার্থিতা কেবল একটি আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি আসলে একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের চাপা কষ্ট, অবদমিত আশা ও নীরব বেদনার রাজনৈতিক উচ্চারণ। যে হিন্দু সম্প্রদায় যুগের পর যুগ এই ভূখণ্ডে বসবাস করেও প্রায়ই নিজ ভূমিতেই নিজেদের অনিরাপদ মনে করেছে—এই নির্বাচন যেন তাদের জন্য নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস এনে দিয়েছে।
কমলাকান্ত রায়ের রাজনৈতিক যাত্রা কোনো হঠাৎ আবির্ভাব নয়। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের কাজ করতে করতে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে কথা বলতে বলতে তিনি বুঝেছেন—সমস্যার গভীরতা কোথায়, আর সমাধানের পথই বা কোন দিকে। তিনি জানেন, কেবল আবেগ দিয়ে রাজনীতি হয় না; লাগে সংগঠন, লাগে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, আর সবচেয়ে বেশি লাগে মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস অর্জনের লড়াইটাই আজ তাঁর মূল পুঁজি।
বিএমজেপি নিজেকে কেবল একটি “সংখ্যালঘুদের দল” হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। তাদের বক্তব্য আরও বড়—বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে, সব নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতেই হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রশ্ন সামনে এনে তারা আসলে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার ন্যায়বিচারের আয়নাটাকেই উঁচু করে ধরছে। কারণ, কোনো রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের মান মাপা যায় সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিককে কীভাবে দেখে ও কীভাবে সুরক্ষা দেয়—এই মানদণ্ডে দাঁড়ালে, বিএমজেপির লড়াই নিছক একটি দলের লড়াই নয়, এটি এক নৈতিক অবস্থানের ঘোষণা।
ত্রয়োদশ নির্বাচনে এই লড়াই তাই অনেক বেশি প্রতীকী। এটি পুরোনো রাজনীতির অভ্যাসের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ, যেখানে মানুষ শুধু “কম খারাপ” বেছে নেওয়ার দোটানায় আটকে থাকতে চায় না। মানুষ এবার জিজ্ঞেস করতে চায়—কে সত্যিই আমাদের কথা বলবে? কে আমাদের ভয়কে সাহসে, আর আমাদের ক্ষোভকে শক্তিতে রূপ দিতে পারবে?
কমলাকান্ত রায় ও তাঁর দল সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে চায় কাজ দিয়ে, উপস্থিতি দিয়ে, ধারাবাহিক সংগ্রাম দিয়ে। তাদের ইশতেহারে শুধু দাবি নয়—আছে ভূমি সুরক্ষা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংখ্যালঘুদের বাস্তব অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার স্পষ্ট রূপরেখা। এগুলো কাগুজে প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকবে, নাকি বাস্তব রূপ পাবে—তার পরীক্ষা অবশ্যই ভোটাররাই নেবেন। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই এজেন্ডাগুলো এতদিন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না।
এই নির্বাচন তাই কেবল একজন প্রার্থীর জয়ের বা পরাজয়ের হিসাব নয়। এটি একটি বার্তা দেওয়ার সুযোগ—বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় আর কেবল করুণা বা দয়ার রাজনীতিতে বাঁচতে চায় না; তারা চায় অধিকার, চায় সম্মান, চায় নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়ার ক্ষমতা।
হয়তো এই পথ দীর্ঘ, হয়তো প্রথম ধাপেই সবকিছু বদলে যাবে না। কিন্তু ইতিহাস বলে, বড় পরিবর্তনগুলো প্রায়ই শুরু হয় ছোট কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপ দিয়ে। বিএমজেপি ও কমলাকান্ত রায়ের এই যাত্রা তেমনই এক পদক্ষেপ—যেখানে স্বপ্ন আছে, ঝুঁকি আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে এক জনগোষ্ঠীর নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছা।
ত্রয়োদশ নির্বাচন তাই শুধু একটি ভোট নয়—এটি হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংখ্যালঘুদের আত্মমর্যাদার নতুন অধ্যায়ের সূচনা। যদি সেই অধ্যায় সত্যিই লেখা শুরু হয়, তবে একদিন ইতিহাস বলবে—এই সময়টাতেই বদলাতে শুরু করেছিল গল্প।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.