সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
পীরগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ের দুটি আলোচিত বিরোধ—একটি রাস্তা সংকোচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, অন্যটি সাবজুডিস জমি নিয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য বাহ্যিকভাবে দেখলে মনে হয় এগুলো আলাদা দুটি ঘটনা। কিন্তু স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান চালালে ধীরে ধীরে উঠে আসছে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন: এই বিরোধগুলো কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত ‘ইন্ধনদাতা চক্র’?
এলাকাবাসীর একটি অংশের অভিযোগের তীর গিয়ে ঠেকছে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির দিকে—পীরডাঙ্গী মাদ্রাসার পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক লিটন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ও বিরোধের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন পক্ষের দাবি, তিনি সরাসরি সামনে না এসে পর্দার আড়াল থেকে পুরো পরিস্থিতিকে উসকে দিচ্ছেন—এক ধরনের “রিংমাস্টার” হিসেবে।
অভিযোগের ভাষ্য অনুযায়ী, কৌশলটি প্রায় একই রকম:
প্রথমে একটি চলমান বা সম্ভাব্য বিরোধকে আরও জটিল করে তোলা,
তারপর উভয় পক্ষের সঙ্গে “সমাধানকারী” বা “মধ্যস্থতাকারী” হিসেবে যোগাযোগ,
এবং শেষ পর্যন্ত ভয়, মামলা-মোকদ্দমা বা সামাজিক চাপের কথা তুলে ধরে আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা।
রাস্তা সংকোচনকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, সেখানে সরাসরি অভিযুক্তদের বাইরে যাদের নাম ঘুরে ফিরে আসছে, তাদের মধ্যে লিটনের নামটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। স্থানীয় কয়েকজন বলেন, বিরোধ চূড়ান্ত রূপ নেওয়ার আগে কয়েক দফা “উসকানিমূলক পরামর্শ” ও “ভয় দেখানোর কৌশল” প্রয়োগ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, মিত্রবাটি মৌজার সাবজুডিস জমি নিয়ে চলমান মামলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কেন পরিস্থিতি বারবার ঘোলাটে হচ্ছে—সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এলাকাবাসী যে নামটি সামনে আনছেন, সেটিও লিটন।
এখানে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টি হলো—এই ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক বিচ্যুতি নয়; এটি একটি অঘোষিত ‘ক্রাইম সিন্ডিকেট’ স্টাইলের কার্যক্রম, যেখানে
আইনি বিরোধকে ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘায়িত করা হয়,
পক্ষগুলোকে আতঙ্কিত করে ফেলা হয়,
এবং শেষ পর্যন্ত বিরোধই হয়ে ওঠে আয়ের উৎস।
একজন শিক্ষকের মতো সামাজিকভাবে সম্মানজনক পেশায় থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠা সমাজের জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক। কারণ শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না; তিনি মূল্যবোধও গড়ে তোলেন। সেই জায়গায় যদি কেউ পর্দার আড়ালে বিরোধকে পুঁজি করে ফায়দা লোটার খেলায় নামেন, তবে সেটি শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়—নৈতিকতারও চরম বিপর্যয়।
তবে এটাও সত্য, এসবই এখনো অভিযোগ ও স্থানীয়দের ভাষ্য। আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে—দুটি আলাদা বিরোধে, একই ধরনের উত্তেজনা, একই ধরনের উসকানি, এবং একই নামের বারবার উচ্চারণ—এগুলো নিছক কাকতালীয় বলে ধরে নেওয়াও কঠিন।
প্রশ্ন হচ্ছে, প্রশাসন কি এই ‘অদৃশ্য কলকাঠি নাড়ার’ বিষয়টি খতিয়ে দেখবে?
নাকি সব দায় গিয়ে পড়বে শুধু সামনের সারির বিবদমান পক্ষগুলোর ওপর, আর পর্দার আড়ালের কারিগররা থেকে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে?
পীরগঞ্জের এই ঘটনাগুলো আমাদের সামনে একটি বড় সত্য তুলে ধরে:
আজ অনেক সময় বিরোধ তৈরি হয় মানুষের প্রয়োজন থেকে নয়, বরং কিছু মানুষের স্বার্থ থেকে।
আর সেই স্বার্থের খেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, আইনের শাসন এবং সামাজিক শান্তি।
এখন দেখার বিষয়—এই ছায়া-সিন্ডিকেটের অভিযোগ আদৌ তদন্তের আলো দেখবে, নাকি সবকিছু আগের মতোই ধোঁয়াশায় ঢাকা পড়ে থাকবে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.