সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
ঠাকুরগাঁও জেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শাহজালাল সাজুর বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পর বিষয়টি স্থানীয় শিক্ষা মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনায় মুজিবুর রহমান নামে এক ব্যক্তি বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আবেদনের প্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মফিজুল হককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহজালাল সাজুকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর শুরুতে তিনি নিয়ম অনুযায়ী প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠতে থাকে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের অধীনে থাকা ৬৫টি দোকানঘরের ভাড়া আদায়ে ব্যাপক অনিয়ম করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজ ও পরিবারের সদস্যদের নামে তিনটি দোকানঘর নামমাত্র ভাড়ায় বরাদ্দ নেন এবং পরে সেগুলো অন্যদের কাছে বেশি ভাড়ায় দিয়ে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন। এতে বিদ্যালয়ের তহবিল বঞ্চিত হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ৩১ জুলাই ২০২৩ তারিখের প্রজ্ঞাপন অমান্য করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিদ্যালয় ফান্ড থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে বেতন গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের অন্যান্য এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রায় ১৬ লাখ টাকা লোকাল বেতন দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পীরগঞ্জের সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাছবীর হোসেনের বদলির দিন বিদ্যালয় ফান্ড থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ছয় মাসের বেতন পরিশোধ করা হলেও প্রভাতি শাখার চাকরিচ্যুত ১০ জন শিক্ষকের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।
এসএসসি ২০২৫ পরীক্ষার কেন্দ্র ফি থেকে আদায়কৃত অর্থের ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার আয় থেকে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে অর্থ তছরুপের অভিযোগও উঠেছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, পরীক্ষাকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি।
এছাড়া ২০২৫ সালে একটি প্রকাশনীর কাছ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা গ্রহণ করে পিকনিক খাতে মাত্র ৬০ হাজার টাকা ব্যয় দেখিয়ে বাকি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। উন্নয়ন কমিটিতে অভিভাবক সদস্যকে আহ্বায়ক দেখানো হলেও তাকে অবহিত না করে উন্নয়নের নামে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের বই দেওয়ার অজুহাতে বা অন্য প্রয়োজনে অফিস কক্ষে ডেকে এনে একাধিক ছাত্রীকে বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানি করেছেন। তার এমন আচরণের প্রতিবাদ করলে কয়েকজন শিক্ষিকাকে হুমকি দেওয়া হয় এবং চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শুধু তাই নয়, শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, পছন্দের ব্যক্তিদের অতিরিক্ত শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, ভোকেশনাল শাখার এক ট্রেড ইন্সট্রাকটরকে দ্বৈত বেতন সুবিধা প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মসজিদ ফি আদায় করেও ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন পরিশোধ না করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মামলা পরিচালনার নামেও প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্য জয়নাল আবেদিন বাবুল বলেন, “নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজের ইচ্ছামতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। ম্যানেজিং কমিটির বৈঠকে এসব অনিয়মের বিষয়ে প্রতিবাদ জানানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। এজন্য আমি ম্যানেজিং কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছি।”
তবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শাহজালাল সাজু তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীন আকতার জানান, অভিযোগটি লিখিতভাবে পাওয়া গেছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রমাণ সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও উঠেছে স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের পক্ষ থেকে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.