সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা-এর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একেবারে পাশে গড়ে উঠেছে একটি ইটভাটা,( DR bricks) । স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাটাটির ধোঁয়া, ধুলা ও শব্দ দূষণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে এ ধরনের শিল্প স্থাপন কেবল নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ নয়, এটি সরাসরি একাধিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য আইনেরও লঙ্ঘন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের মূল ফটকের কাছেই দূর থেকে দৃশ্যমান একটি উঁচু চিমনি থেকে প্রতিনিয়ত কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিযোগ ;ইটভাটার ধোঁয়া ও ছাই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীরা শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। অনেক সময় শ্রেণিকক্ষের জানালা বন্ধ করে পাঠদান করতে হয়, যা শিক্ষার পরিবেশকে আরও সংকুচিত করে দেয়।
বাংলাদেশে ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনার বিষয়ে স্পষ্ট আইন রয়েছে। Brick Manufacturing and Brick Kilns Establishment (Control) Act 2013 অনুযায়ী কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বা জনবসতির নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংরক্ষিত এলাকা ও জনবসতির নিকটবর্তী স্থানে ইটভাটা স্থাপন করলে তা আইনত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একই আইনের ধারা ১৫ অনুযায়ী এই বিধান লঙ্ঘন করলে জরিমানা, এমনকি কারাদণ্ডেরও বিধান রয়েছে।
এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টিও আইনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। Environment Conservation Act 1995 এর ধারা ৬ ও ৭ অনুযায়ী পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর শিল্প স্থাপনের আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র (Environmental Clearance) নেওয়া বাধ্যতামূলক। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি করে, তবে পরিবেশ অধিদপ্তর সেটি বন্ধ করার ক্ষমতা রাখে।
পরিবেশবিদদের মতে, ইটভাটার ধোঁয়ায় কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ও ক্ষতিকর ধূলিকণা থাকে, যা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক। শিশুদের ফুসফুস এখনো পূর্ণ বিকশিত না হওয়ায় এসব দূষণের প্রভাব তাদের উপর বেশি পড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হাঁপানি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
স্থানীয় এক অভিভাবক বলেন, “আমাদের সন্তানরা পড়াশোনা করতে আসে, কিন্তু ইটভাটার ধোঁয়ায় তাদের কষ্ট হয়। অনেক সময় কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভোগে। আমরা চাই দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হোক।”
বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, “শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বাতাসে ধুলা ও ধোঁয়া থাকলে শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক পরিবেশ থাকে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে এমন শিল্প থাকা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা থাকলে সেটি বন্ধ করা অথবা স্থানান্তর করা বাধ্যতামূলক।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার কেন্দ্র। সেই প্রতিষ্ঠানের পাশে যদি দূষণকারী শিল্প গড়ে ওঠে, তবে তা কেবল পরিবেশ নয়, পুরো প্রজন্মের সুস্থ বিকাশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি স্থানীয়দের জোর দাবি,ঘটনাটি দ্রুত তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশে পড়াশোনা করার সুযোগ পায়। কারণ শিক্ষা ও পরিবেশ—দুটিই একটি জাতির টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.