সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
ফাল্গুনের পূর্ণিমা মানেই রঙের আহ্বান। আর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে পীরগঞ্জ উপজেলার ৮ নং দৌলতপুর ইউনিয়নে উদ্যাপিত হলো দোল পূর্ণিমা উৎসব। গ্রামবাংলার স্বাভাবিক শান্ত পরিবেশ যেন একদিনের জন্য রূপ নিল রঙিন আনন্দমেলায়। সাগুনী শালবন এলাকার মন্দির প্রাঙ্গণকে কেন্দ্র করে দিনভর চলেছে পূজা, কীর্তন ও আবির খেলায় ভক্তদের উচ্ছ্বাস।
দোল পূর্ণিমা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পার্বণ। বৈষ্ণব ধর্মমতে এই পূর্ণিমা তিথিতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু। তাই দিনটি গৌর পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। দৌলতপুর ইউনিয়নের ভক্তরা সকাল থেকেই শালবনের ছায়ায় সমবেত হয়ে নামসংকীর্তন ও পূজার আয়োজন করেন। শঙ্খধ্বনি, করতাল আর মৃদঙ্গের তালে ভক্তিময় পরিবেশ সৃষ্টি হয় পুরো এলাকায়।
পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী বৃন্দাবনে শ্রী কৃষ্ণ আবির ও গুলাল নিয়ে রাধা এবং গোপীগণের সঙ্গে হোলি খেলেছিলেন। সেই প্রেম ও ভক্তির লীলাই দোল উৎসবের মূল প্রেরণা। দৌলতপুর ইউনিয়নের আয়োজকেরা জানান, দোল কেবল রঙ খেলা নয়; এটি আত্মিক আনন্দের প্রকাশ এবং ভক্তির বহিঃপ্রকাশ।
সাগুনী শালবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ উৎসবকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। শালগাছের সারির নিচে ভক্তরা প্রথমে পূজা অর্চনা সম্পন্ন করেন। এরপর শুরু হয় একে অপরকে আবির ছড়িয়ে শুভেচ্ছা জানানোর পর্ব। শিশু-কিশোরদের মধ্যে ছিল সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস। তাদের হাসি আর রঙিন মুখ পুরো পরিবেশকে করে তোলে প্রাণবন্ত।
ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতি বছরই দোল উৎসব এখানে মিলনমেলায় পরিণত হয়। অনেকে দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন নিয়ে আসেন এই দিনে অংশ নিতে। কেউ মিষ্টান্ন বিতরণ করেন, কেউ কীর্তনের আসরে যোগ দেন। দৌলতপুর ইউনিয়নের প্রবীণ এক ভক্ত বলেন, “দোল আমাদের কাছে শুধু উৎসব নয়, এটি সামাজিক বন্ধনের দিন। এই দিনে ভেদাভেদ ভুলে সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করি।”
উৎসব ঘিরে ছিল শৃঙ্খলা ও সচেতনতার বার্তাও। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, কাউকে জোর করে রঙ না দেওয়া এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় যুবকরাও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যাতে উৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।
৮ নং দৌলতপুর ইউনিয়নের এই আয়োজন প্রমাণ করে, গ্রামীণ সমাজে ধর্মীয় উৎসব শুধু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক সংহতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। শালবনের ছায়ায় দোলের রঙ যেন মানুষের মনেও ছড়িয়ে দিয়েছে সম্প্রীতির আবির।
ফাল্গুনের পূর্ণিমার চাঁদ যখন আকাশে উদিত হয়, তখন সাগুনী শালবনের নীরবতা ভেদ করে শোনা যায় কীর্তনের সুর। আবিরের লাল, হলুদ ও সবুজ রঙে রাঙা মুখগুলো যেন জানান দেয় দোল মানে আনন্দ, দোল মানে মিলন।
দৌলতপুর ইউনিয়নের মানুষদের কাছে এই উৎসব কেবল একটি দিন নয়; এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। বসন্তের এই রঙিন আয়োজন আবারও স্মরণ করিয়ে দিল প্রকৃতির মতো মানুষের হৃদয়ও রঙিন হতে পারে, যদি সেখানে থাকে ভক্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.