সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে রমজান এলেই সন্ধ্যার আগমুহূর্ত বদলে যায় অন্য এক ছন্দে। বিকেল গড়াতেই উপজেলার প্রধান সড়ক, বাজারের মোড় আর অলিগলি ভরে ওঠে ইফতারের পসরা নিয়ে বসা দোকানিদের হাঁকডাকে। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে ভেসে আসে বেগুনি, পেঁয়াজু, ছোলা, জিলাপির গন্ধ যেন রোজাদারদের জন্য এক নীরব আমন্ত্রণ।
পীরগঞ্জ বাজারের চিত্র এখন জমজমাট। ফলের দোকানে সাজানো খেজুর, তরমুজ, বাঙ্গি আর আঙুরের স্তূপ। ভাজাপোড়ার দোকানে বড় কড়াইয়ে টগবগ করে ফুটছে তেল। ইফতারের আগ মুহূর্তে ক্রেতাদের ভিড়ে হাঁটাচলা দায়। কর্মজীবী মানুষ অফিস শেষে, কৃষক মাঠের কাজ সেরে, শিক্ষার্থীরা কোচিং বা ক্লাস শেষ করে ভিড় করছেন বাজারে। সবার লক্ষ্য পরিবারের জন্য সেরা ইফতার সামগ্রী সংগ্রহ।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজান মাস তাদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে। এক ভাজাপোড়া বিক্রেতা জানান, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এ মাসে বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ। তবে কাঁচামালের দাম বাড়ায় লাভের অঙ্ক আগের মতো নেই। ছোলা, ডাল, তেল ও চিনি প্রতিটি পণ্যের দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। ফলে ক্রেতাদেরও হিসাব করে কিনতে হচ্ছে।
ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে। এক গৃহিণী বলেন, পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রতিদিন ইফতারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তবুও রমজানের আনন্দ ও আধ্যাত্মিক আবহ ধরে রাখতে তারা চেষ্টা করছেন সাধ্যের মধ্যে ভালো আয়োজন রাখতে।
বাজারের ভিড় সামলাতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যরা কাজ করছেন, যাতে যানজট কম থাকে এবং ক্রেতারা নির্বিঘ্নে কেনাকাটা করতে পারেন। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ টিম বাজার তদারকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী, যাতে নিত্যপণ্যের মূল্য স্বাভাবিক রাখা যায় এবং ভেজাল বা অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি বন্ধ থাকে।
ইফতারের বাজার শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি সামাজিক মিলনমেলাও। অনেকেই বন্ধু বা পরিচিতজনের সঙ্গে দেখা করে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। ছোট শিশুরা বাবার হাত ধরে জিলাপি বা শরবতের বায়না করছে। রোজার ক্লান্তি সত্ত্বেও মানুষের চোখেমুখে এক ধরনের প্রশান্তি ও প্রত্যাশা স্পষ্ট ইফতারের মুহূর্তকে ঘিরে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার গ্রহণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি। পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা গেলে ইফতারের বাজার আরও নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত হতে পারে।
সন্ধ্যার আজান ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে বাজারের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়। যে যার বাড়ির পথে ছুটে যান ইফতারে অংশ নিতে। কিছু দোকানি তখনও ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের বিক্রিতে। পীরগঞ্জের ইফতারের বাজার এভাবেই রমজানের প্রতিদিনের গল্প রচনা করছে কর্মচাঞ্চল্য, আনন্দ, উদ্বেগ আর আধ্যাত্মিকতার মিশেলে।
রমজানজুড়ে এ প্রাণচাঞ্চল্য অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা। তবে সবার প্রত্যাশা একটাই দাম নিয়ন্ত্রণে থাকুক, মান বজায় থাকুক, আর ইফতারের এই আনন্দ হোক নিরাপদ।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.