সম্পাদকীয়ঃ
শুধু মুখে পরিবর্তনের কথা বললে পরিবর্তন আসে না। আন্তরিকতা লাগে, টেকসই সিদ্ধান্ত লাগে, ধারাবাহিক উদ্যোগ লাগে। আমরা প্রায়ই শুনি, মাদক থেকে সন্তানদের বাঁচাতে হবে। সভা-সমাবেশে, বক্তৃতায়, জাতীয় দিবসে এ কথা বারবার উচ্চারিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাস্তবে আমরা তাদের জন্য কী বিকল্প তৈরি করছি?
মাদকবিরোধী লড়াই কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিষয়। একজন কিশোর বা তরুণ যদি বিকেলে মাঠ না পায়, সৃজনশীল ব্যস্ততা না পায়, প্রতিযোগিতার উত্তেজনা না পায়, তবে সে কোথায় যাবে? খেলাধুলা তার স্বাভাবিক বিকাশের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। অথচ আজ খেলার কথা উঠলেই সীমাবদ্ধতা এসে দাঁড়ায় ক্রিকেট আর ফুটবলে।
একসময় স্কুল মানেই ছিল বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। দৌড়, একশ মিটার, দুইশো মিটার, ম্যারাথন, হাই জাম্প, লং জাম্প,মোরগ লড়াই, বল নিক্ষেপ, বর্ষা নিক্ষেপ, চাক্কি নিক্ষেপ, কত আয়োজন, কত উৎসবমুখর পরিবেশ। শুধু তাই নয়, হাডুডু, ভলিবল, হ্যান্ডবল, ব্যাডমিন্টন ছিল নিয়মিত চর্চার অংশ। পাড়া-মহল্লায় দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, বউছি, কানামাছি,লাটিম,রানরান,ডাংগুলি,এক্কাদোক্কা এসব খেলায় বড় হতো একটি প্রজন্ম। সেখানে ছিল দলগত চেতনা, শারীরিক সক্ষমতা, কৌশল আর বন্ধুত্বের বন্ধন।
আজ সেই চিত্র ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। মাঠ কমে গেছে, প্রতিযোগিতা কমেছে, উদ্যোগ কমেছে। শিশুরা মোবাইল স্ক্রিনে ব্যস্ত, কিশোররা অনিশ্চিত সময় কাটাচ্ছে উদ্দেশ্যহীনভাবে। এ শূন্যতার সুযোগেই ঢুকে পড়ে মাদক, অসামাজিক কর্মকাণ্ড, হতাশা।
নীতি নির্ধারকদের প্রতি প্রশ্ন, খেলাধুলার কথা শুধু বক্তৃতায় থাকবে কেন? স্কুল-কলেজে নিয়মিত ক্রীড়া আয়োজন বাধ্যতামূলক করা যায় না? জাতীয় দিবসগুলোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার প্রতিযোগিতা অন্তর্ভুক্ত করা যায় না? ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া কি এতই কঠিন?
খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়, এটি চরিত্র গঠনের মাধ্যম। মাঠে হার-জিত শেখা যায়, শৃঙ্খলা শেখা যায়, নেতৃত্ব শেখা যায়। একজন খেলোয়াড় সহজে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে না, কারণ তার সামনে লক্ষ্য থাকে, দল থাকে, স্বপ্ন থাকে।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে তরুণ প্রজন্মকে বিকল্প দিতে হবে। সেই বিকল্প হতে পারে বই, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি আর অবশ্যই খেলাধুলা। মাঠ ফিরিয়ে দিলে, খেলাকে ফিরিয়ে দিলে, আমরা শুধু শরীরচর্চা নয়; একটি সুস্থ, প্রাণবন্ত ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব।
এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কাজ। সিদ্ধান্তের চেয়ে বাস্তবায়ন। কারণ আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কোনো বক্তৃতার বিষয় নয়, এটি দায়িত্বের বিষয়।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.