সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
পৌর শহরের প্রধান সড়কের একাংশজুড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী তুলার দোকান। খোলা আকাশের নিচে স্তূপ করে রাখা তুলা, আর ক্রেতা টানতে দোকানিরা লাঠি দিয়ে তুলোধুনো করছেন প্রকাশ্যে। দৃশ্যটি যেন সাধারণ বেচাকেনা কিন্তু এর অদৃশ্য দিকটি উদ্বেগজনক। বাতাসে ভেসে বেড়ানো সূক্ষ্ম তুলা-তন্তু সরাসরি পথচারীদের শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করছে। চিকিৎসকরা বলছেন, নিয়মিত এ ধরনের কণার সংস্পর্শে এলে ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “দোকানগুলো রাস্তার উপরই বসে। লাঠি দিয়ে তুলা পেটানোর সময় সাদা ধুলা চারদিকে উড়ে যায়। হাঁটতে গেলে চোখ-মুখ ঢাকতে হয়।” স্কুলগামী এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, শিশুরা প্রতিদিন এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে; কাশি ও শ্বাসকষ্টের অভিযোগ বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, তুলা প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় যে ধুলিকণা তৈরি হয়, তা দীর্ঘসময় শ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করলে অ্যালার্জি, ব্রঙ্কাইটিস এমনকি বাইসিনোসিসের মতো পেশাগত রোগের ঝুঁকি তৈরি করে। শিল্পাঞ্চলে তুলা কলকারখানায় শ্রমিকদের জন্য মাস্ক, ভেন্টিলেশন ও সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক থাকে। কিন্তু জনবহুল সড়কে একই প্রক্রিয়া খোলা পরিবেশে চললে ঝুঁকির পরিধি আরও বিস্তৃত হয় কারণ এখানে অসংখ্য সাধারণ মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবে এক্সপোজড হচ্ছেন।
আইনগত দিকও উপেক্ষিত নয়। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫–এর ৬ ও ৭ ধারায় বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রম রোধে কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬–এ জনপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও জনদুর্ভোগ ঘটানোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে, যা অন্যান্য পৌর এলাকাতেও অনুরূপ নীতিতে প্রয়োগযোগ্য। পৌরসভা আইন অনুযায়ী, প্রধান সড়ক দখল করে ব্যবসা পরিচালনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “খোলা স্থানে তুলা পেটালে যে সূক্ষ্ম তন্তু ছড়ায়, তা শ্বাসতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। দীর্ঘমেয়াদে এটি অ্যাজমা বা ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।” তিনি প্রশাসনের নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দেন।
তবে দোকানিরা ভিন্ন যুক্তি দিচ্ছেন। একজন ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা বহু বছর ধরে এখানে বসে আছি। দোকান ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য নেই। খোলা জায়গায় না করলে ব্যবসা চলে না।” অর্থনৈতিক বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে একজনের জীবিকা কি অসংখ্য মানুষের স্বাস্থ্যের বিনিময়ে চলতে পারে?
পৌর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। “প্রধান সড়কে এভাবে ব্যবসা করা নিয়মবহির্ভূত। আমরা নোটিশ দিয়ে বিকল্প স্থানে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেব।” তবে স্থানীয়রা বলছেন, মৌখিক সতর্কতা দিয়ে সমস্যা সমাধান হয়নি; কার্যকর অভিযান প্রয়োজন।
সমাধান কী? প্রথমত, জনবহুল সড়ক থেকে এমন কার্যক্রম সরিয়ে নির্দিষ্ট বাজার বা শেডের ভেতরে স্থানান্তর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তুলা প্রক্রিয়াকালে ডাস্ট-কন্ট্রোল ব্যবস্থা যেমন ঢাকা জায়গা, ভেন্টিলেশন ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, নিয়মিত মনিটরিং ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
প্রধান সড়ক কেবল যান চলাচলের পথ নয়; এটি জনজীবনের ধমনী। সেখানে অবাধ তুলোধুনো শুধু নান্দনিকতার প্রশ্ন নয় এটি জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন। সময় থাকতে প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত পদক্ষেপই পারে শহরকে নিরাপদ রাখতে। নইলে অদৃশ্য সাদা ধুলার আড়ালে জমতে থাকবে নিঃশব্দ
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.