সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ প্রশাসনিক ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থানীয় প্রশাসনিক পরিসরে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ছবিতে দেখা যায় শতাধিক সরকারি কর্মচারী ও কর্মচারী সংগঠনের প্রতিনিধিরা একত্র হয়ে একটি সুসংগঠিত ব্যানার হাতে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি উপস্থাপন করছেন। কর্মসূচির স্থান, ব্যানারের ভাষা ও অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি নিয়মিত প্রতিবাদ নয়; বরং সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের আর্থিক ও কাঠামোগত অসন্তোষের দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ।
ছবির ব্যানারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে জাতীয় বেতন কমিশন–২০২৫ এর সুপারিশকৃত নবম পে-স্কেল ও গ্রেড দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে এই অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। কর্মসূচিটি ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত চলমান থাকার ঘোষণাও ব্যানারে দৃশ্যমান। বাস্তবায়নকারী হিসেবে উল্লেখ আছে সকল কর্মচারী ও কর্মচারী বন্ধু, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও। অর্থাৎ এটি কোনো একক সংগঠনের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়; বরং স্থানীয় পর্যায়ের সর্বস্তরের সরকারি কর্মচারীদের সম্মিলিত কর্মসূচি।
ছবির পটভূমিতে থাকা উপজেলা পরিষদ প্রশাসনিক ভবনটি এই আন্দোলনের প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। প্রশাসনের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে কর্মচারীরা তাদের দাবি উত্থাপন করছেন যা একদিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি আনুগত্যের বার্তা দেয়, অন্যদিকে সেই কাঠামোর ভেতরে থেকেই ন্যায্য অধিকারের দাবি জানানোর সাংবিধানিক চর্চাকে সামনে আনে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে নারী কর্মচারীদের উপস্থিতিও লক্ষণীয়, যা আন্দোলনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে নির্দেশ করে।
ছবিতে অংশগ্রহণকারীদের মুখাবয়ব ও ভঙ্গিমা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—এটি কোনো হঠাৎ উত্তেজনাপূর্ণ কর্মসূচি নয়। বরং শান্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং বার্তাকেন্দ্রিক একটি অবস্থান কর্মসূচি। ব্যানারের ভাষাও আক্রমণাত্মক নয়; দাবি নির্ভর ও প্রাতিষ্ঠানিক। এটি ইঙ্গিত দেয় যে সরকারি কর্মচারীরা সংঘাত নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান প্রত্যাশা করছেন। তবে একই সঙ্গে এই শান্ত ভঙ্গির আড়ালে জমে থাকা ক্ষোভ ও প্রত্যাশার গভীরতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা নতুন নয়। মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকারি কর্মচারীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন—বর্তমান বেতন কাঠামো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ছবির এই কর্মসূচি সেই কাঠামোগত সংকটের স্থানীয় প্রতিফলন। পীরগঞ্জের মতো উপজেলা পর্যায়ে যখন এমন সংগঠিত প্রতিবাদ দেখা যায়, তখন ধরে নেওয়া যায়—এই অসন্তোষ কেবল কেন্দ্রীয় শহরকেন্দ্রিক নয়; এটি তৃণমূল প্রশাসন পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই ছবিটি ভবিষ্যতের জন্য একটি দলিল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায়, কীভাবে প্রশাসনের ভিতরে থাকা কর্মচারীরাই নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হচ্ছেন—তাও শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। নীতিনির্ধারকদের জন্য এই ছবি একটি বার্তা বহন করে: বেতন কাঠামো কেবল অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি প্রশাসনিক দক্ষতা, কর্মপ্রেরণা ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
সবশেষে বলা যায়, পীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই অবস্থান কর্মসূচির ছবি একটি নির্দিষ্ট দিনের প্রতিবাদকে ছাড়িয়ে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এটি সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্যতার প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায় এবং তৃণমূল প্রশাসনের চাপা ক্ষোভ সবকিছুকে এক ফ্রেমে বন্দি করেছে। এই দাবি কত দ্রুত এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা ভবিষ্যৎই বলবে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.