সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
বাংলাদেশের খুচরা বাজারে কসমেটিকস ও কাপড়ের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ও জনপ্রিয় পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্য নিয়ে অনিয়ম একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের অস্বাভাবিক পার্থক্য, মূল্য তালিকা না থাকা, এমনকি ক্যাশ মেমো সংরক্ষণ না করা বা সাংবাদিক ও তদারকি কর্মকর্তাদের প্রদর্শনে অনিচ্ছা এসব আচরণ সরাসরি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর লঙ্ঘন।
ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের আইনানুগ পার্থক্য
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কোনো পণ্যের বিক্রয়মূল্য অবশ্যই যুক্তিসংগত হতে হবে। আইন সরাসরি “কত শতাংশ লাভ করা যাবে” তা নির্ধারণ না করলেও, ধারা ৪০ অনুযায়ী অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত মূল্য আদায়কে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বিশেষ করে কসমেটিকস ও কাপড়ের ক্ষেত্রে—
আমদানিকৃত কসমেটিকস পণ্যে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, পরিবহন ও যুক্তিসংগত মুনাফা যুক্ত করা যেতে পারে।
দেশীয় কাপড় বা তৈরি পোশাকে উৎপাদন ব্যয়, শ্রম, পরিবহন ও যুক্তিসংগত লাভ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
কিন্তু কোনো পণ্যের প্রকৃত ক্রয়মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দাম বসানো, মৌসুমি বা উৎসবের অজুহাতে অতিরিক্ত মূল্য আরোপ, কিংবা ভিন্ন ভিন্ন ক্রেতার কাছে ভিন্ন দামে বিক্রি করা আইনের দৃষ্টিতে প্রতারণা হিসেবে বিবেচিত।
মূল্য তালিকা ও ক্যাশ মেমোর বাধ্যবাধকতা
আইনের ধারা ৩৮ অনুযায়ী প্রতিটি দোকানে দৃশ্যমান স্থানে পণ্যের মূল্য তালিকা প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে বিক্রয়ের সময় ভোক্তাকে ক্যাশ মেমো বা রশিদ প্রদান করতে হবে, যেখানে দোকানের নাম, ঠিকানা, পণ্যের নাম, পরিমাণ, মূল্য ও তারিখ উল্লেখ থাকবে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় অনেক কসমেটিকস ও কাপড়ের দোকানে মূল্য তালিকা নেই।
ক্যাশ মেমো ইচ্ছাকৃতভাবে দেওয়া হয় না।
দোকান কর্তৃপক্ষ দাবি করে, “মেমো শেষ”, “সিস্টেম নেই” বা “এটা পাইকারি দোকান”।
এসব অজুহাত আইনের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়।
ক্যাশ মেমো না রাখা বা প্রদর্শনে অনিচ্ছা কতটা বেআইনি?
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ক্যাশ মেমো সংরক্ষণ ও প্রয়োজনে প্রদর্শন করা দোকানির আইনগত দায়িত্ব। সাংবাদিক, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বা তদারকি সংস্থার কাছে ক্যাশ মেমো দেখাতে অস্বীকৃতি জানানো মানে—
ধারা ৪৫ অনুযায়ী তদন্ত কাজে বাধা প্রদান
ধারা ৪০ ও ৫২ অনুযায়ী প্রতারণামূলক বাণিজ্য আচরণ
এটি সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
শাস্তি ও জরিমানার বিধান
আইন লঙ্ঘনের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তির পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে—
অতিরিক্ত মূল্য আদায়, ভেজাল বা প্রতারণার প্রমাণ মিললে
সর্বোচ্চ ২ (দুই) বছর কারাদণ্ড অথবা
সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড (ধারা ৪০)
মূল্য তালিকা না রাখা বা ক্যাশ মেমো না দেওয়া হলে
৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা (ধারা ৩৮)
তদন্তে বাধা বা তথ্য গোপন করলে
১ বছর কারাদণ্ড বা
৫০ হাজার টাকা জরিমানা (ধারা ৪৫)
উপসংহার
কসমেটিকস ও কাপড়ের বাজারে মূল্য নিয়ে স্বচ্ছতা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা। ক্যাশ মেমো না রাখা, মূল্য তালিকা প্রদর্শনে অনীহা কিংবা সাংবাদিকের প্রশ্নে অসহযোগিতা এসব আচরণ স্পষ্টভাবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর লঙ্ঘন। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সচেতন নাগরিক নজরদারি ছাড়া এই অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। ভোক্তা যেমন সচেতন হবে, তেমনি প্রশাসনের নিয়মিত অভিযানই পারে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.