সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
ঠাকুরগাঁও–৩ আসনের রাজনীতি মানেই শুধু ভোটের অঙ্ক নয়,এটা ইতিহাস, বঞ্চনা আর বারবার ভাঙা স্বপ্নের গল্প। পীরগঞ্জ উপজেলার ৭, ৮, ৯, ১০ ও ১১ নম্বর ইউনিয়নের মানুষের কাছে নির্বাচন মানে ঢাকামুখী নেতাদের প্রতিশ্রুতি শোনা, তারপর আবার নীরব হয়ে যাওয়া। এই প্রেক্ষাপটে সিপিবির প্রার্থী কমরেড মুনসুর-এর সন্তান প্রভাত সমীর শাহাজান আলম নামটি কেবল একটি প্রার্থীর পরিচয় নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক স্মৃতির পুনর্জাগরণ।
পীরগঞ্জের ভূগোল কঠিন খরা, নদীর চর, বন্যা আর অনিশ্চিত কৃষি এই অঞ্চলের নিত্যসঙ্গী। ৭ নম্বর ইউনিয়নের এক কৃষক বলেন,
“আমরা চাষ করি, কিন্তু লাভ করে ফড়িয়া। ভোট দেই, কিন্তু লাভ করে শহরের নেতা।”
এই বঞ্চনার মধ্যেই বড় হয়েছেন প্রভাত সমীর শহরের রাজনীতির আরামে নয়, বরং মাঠের রাজনীতির কঠোরতায়।
কমরেড মুনসুর ছিলেন সেই প্রজন্মের রাজনীতিক, যিনি ক্ষমতার নয় সংগ্রামের ভাষায় কথা বলতেন। তার সন্তান হিসেবে প্রভাত সমীরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উত্তরাধিকার নয়, বিশ্বাসযোগ্যতা। কিন্তু পীরগঞ্জের মানুষ উত্তরাধিকার নয়, চর্চা দেখে। ৮ নম্বর ইউনিয়নের এক স্কুলশিক্ষকের ভাষায়,
“ছেলেটা বক্তৃতা কম দেয়, প্রশ্ন বেশি শোনে,এটাই পার্থক্য।”
পীরগঞ্জের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় পরিচয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থানীয় উপস্থিতি। বড় দলগুলো এখানে ভোটের সময় আসে, আর যায় ক্ষমতার পথে। কিন্তু প্রভাত সমীর শাহাজান আলমের প্রচারণা দেখা যাচ্ছে হাটে, মাঠে, চায়ের দোকানে। ৯ নম্বর ইউনিয়নের এক নারী ভোটার বলেন,
“ও কথা বলে আমাদের মতো করে। বড় বড় শব্দ ব্যবহার করে না।”
এটাই তার শক্তি রাজনীতিকে সহজ ভাষায় নামিয়ে আনা।
যেখানে অন্য প্রার্থীরা উন্নয়নের মেগা প্রকল্পের কথা বলেন, সেখানে প্রভাত সমীর কথা বলেন কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার না থাকার কষ্ট, স্কুলে শিক্ষকের কোচিং বাণিজ্য নিয়ে।
১০ নম্বর ইউনিয়নের এক যুবকের ভাষ্য,
“আমরা চাকরি চাই না, আমরা সুযোগ চাই। সে কথাটা উনি বুঝেন।”
এই ‘বোঝা’টাই রাজনীতির মূলধন।
রাজনৈতিকভাবে পীরগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে দ্বিধাবিভক্ত,একদিকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, অন্যদিকে প্রতিবাদের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস। সিপিবি এখানে কখনো সংখ্যার রাজনীতি করেনি, করেছে নৈতিক রাজনীতি। প্রভাত সমীর সেই ধারার আধুনিক রূপ,যিনি আদর্শকে ভারী বইয়ে নয়, বাস্তব দাবিতে রূপ দিচ্ছেন।
১১ নম্বর ইউনিয়নের এক প্রবীণ বলেন,
“কমরেড মুনসুর আমাদের সাথে মাঠে নামতেন। ছেলে যদি তার অর্ধেকও হয়, তাতেই চলবে।”
এই বক্তব্যে আছে আবেগ, আছে মানদণ্ড।
প্রভাত সমীর শাহজাহান আলমের প্রার্থিতা তাই শুধু সিপিবির নয়,এটা পীরগঞ্জের মানুষের রাজনৈতিক বিকল্প খোঁজার আকুতি। তিনি জানেন, এই আসনে জেতা কঠিন। কিন্তু তিনি এটাও জানেন,রাজনীতি কেবল জেতা নয়, বয়ান বদলানো।
ঠাকুরগাঁও–৩-এর এই নির্বাচনে প্রভাত সমীরের উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়,রাজনীতি এখনো পুরোপুরি পণ্য হয়ে যায়নি। কিছু মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, রাজনীতি হতে পারে মানুষের জন্য, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর হাতিয়ার।
পীরগঞ্জের মাঠে তাই এবার শুধু ভোটের লড়াই নয়,এটা স্মৃতি বনাম বিস্মৃতি, আদর্শ বনাম সুবিধাবাদের সংঘর্ষ। আর এই সংঘর্ষে প্রভাত সমীর একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছেন,রাজনীতি কি আবার মানুষের ঘরে ফিরতে পারে না?
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.