সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
শীতের শেষপ্রান্তে বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে এই পূজা কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি পরিণত হয়েছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় মানুষের মিলনমেলায়। কলেজ প্রাঙ্গণ সাজানো হয়েছিল রঙিন আলোকসজ্জা, ফুলের তোড়া ও শিল্পিত আলপনায়। সকাল থেকেই ঢাক-ঢোল ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, সরস্বতী হলেন বিদ্যা, বুদ্ধি, সুর ও সৃজনশীলতার দেবী। তাঁর আরাধনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জনের পথে অগ্রসর হওয়ার অনুপ্রেরণা লাভ করে। পীরগঞ্জ সরকারি কলেজে এ উপলক্ষে স্থাপিত প্রতিমাটিও ছিল নান্দনিক কারুকাজে সমৃদ্ধ—হাতে বীণা, পায়ের নিচে রাজহাঁস, শান্ত ও মঙ্গলময় দৃষ্টিতে যেন তিনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পথচলার দিশা দিচ্ছেন।
সকালে পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানসূচি। এরপর চলে প্রসাদ বিতরণ ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। কলেজের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন করে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই আয়োজনকে দিয়েছে সম্প্রীতির অনন্য মাত্রা। শিক্ষকরা বলেন, এই ধরনের অনুষ্ঠান শিক্ষার্থীদের মননে সৌহার্দ্য, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ বদরুল হুদা। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “সরস্বতী পূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি জ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার প্রতীক। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল সনদ অর্জন নয়, বরং মানবিকতা, নৈতিকতা ও মননের উৎকর্ষ সাধন।” তিনি আরও বলেন, “পীরগঞ্জ সরকারি কলেজ সব সময়ই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে লালন করে। আজকের এই আয়োজন তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
অধ্যক্ষ বদরুল হুদা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “তোমরা যেন জ্ঞানকে জীবনের মূল পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করো। বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে জ্ঞানকে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাও—এই হোক সরস্বতী পূজার প্রকৃত শিক্ষা।” তাঁর বক্তব্যে উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা করতালির মাধ্যমে সম্মতি জানান।
কলেজের শিক্ষক পরিষদের এক সদস্য বলেন, প্রতিবছর এই পূজা আয়োজন করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও দলগত কাজের মানসিকতা তৈরি হয়। তারা নিজেরাই মণ্ডপ সাজানো থেকে শুরু করে অনুষ্ঠান পরিচালনার নানা কাজে যুক্ত থাকে। এতে নেতৃত্বগুণ ও সাংগঠনিক দক্ষতাও বিকশিত হয়।
শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছিল বাড়তি উচ্ছ্বাস। একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রী জানায়, এই দিনটির জন্য তারা অনেকদিন ধরেই প্রস্তুতি নেয়। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে মণ্ডপ সাজানো, আলপনা আঁকা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের রিহার্সাল—সব মিলিয়ে এটি তাদের কলেজ জীবনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।
দুপুরের দিকে পূজা সমাপ্তির পর প্রসাদ বিতরণ ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দিনের আনুষ্ঠানিকতা। ক্যাম্পাসজুড়ে তখনো রয়ে যায় উৎসবের রেশ। শিক্ষার্থীরা ছবি তোলে, শিক্ষকরা তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। সব মিলিয়ে পীরগঞ্জ উপজেলার সরকারি কলেজে এবারের সরস্বতী পূজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসবে পরিণত হয়। এই আয়োজন আবারও প্রমাণ করল—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই পারে সমাজে আলো ছড়িয়ে দিতে, পারে মানুষের মননে সৌন্দর্য ও সহাবস্থানের বীজ বপন করতে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.