সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় শিক্ষাব্যবস্থা আজ গভীর এক নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। যে শিক্ষা একসময় মানুষ গড়ার কারখানা হিসেবে বিবেচিত হতো, তা আজ অনেক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে নির্মম বাণিজ্যের যন্ত্রে। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের একটি অংশ প্রকাশ্যেই কোচিং বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ায় এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নিয়মনীতি, নৈতিকতা কিংবা রাষ্ট্রের দেওয়া দায়িত্ব—কিছুই যেন তাদের কাছে আর বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার বদলে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে কোচিং সেন্টারে টানাই এখন অনেকের প্রধান লক্ষ্য।
পীরগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে এবং অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। অভিযোগের তালিকায় উঠে এসেছে মিরপুর ক্যাডেট কোচিংয়ের পরিচালক ও ডিএন ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক আব্দু রহিম,পিনাকল কোচিংয়ের বকুল মহাবুব জুটি,মেধাবিকাশ কোচিংয়ে রয়েছেন পীরগঞ্জ বণিক সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজু, লিয়াকত আলী, আখলাতুন নূরী, নূর আলম সিদ্দিকী এবং পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য বিভাগে ৬ নম্বর ইউনিয়নে কর্মরত আব্দুল কাইয়ুমের নাম। পাশাপাশি অভিযোগের তীর বিশেষভাবে গেছে ৭ নম্বর হাজীপুরের ভেবড়া বোর্ডেরহাট ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার জাহিরুল ইসলাম এবং ডিএন ডিগ্রি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের প্রদর্শক হযরত আলীর দিকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হযরত আলী ও তার ভাই আমজাদ আলী পীরগঞ্জে গড়ে তুলেছেন এক ধরনের ‘কোচিং সাম্রাজ্য’। তারা শুধু নিজেরাই নন, আরও কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে একটি শক্তিশালী চক্র তৈরি করেছেন, যারা নিয়মিত ক্লাসে পাঠদানে গাফিলতি করে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছেন কোচিংমুখী হতে।
একজন অভিভাবক ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “স্কুলে-মাদ্রাসায় বেতন দিই এই আশায় যে সেখানেই আমার সন্তান ঠিকভাবে পড়বে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ক্লাসে স্যাররা ঠিকমতো পড়ান না। বলেন, কোচিংয়ে আসলেই সব বুঝিয়ে দেবেন। কোচিংয়ে না গেলে নম্বর কম দেওয়া হবে, ফেল করিয়ে দেওয়া হবে—এমন ভয় দেখানো হয়।” এই বক্তব্য শুধু একজনের নয়; এটি পীরগঞ্জের অসংখ্য অভিভাবকের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশার প্রতিচ্ছবি।
একজন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, “ক্লাসে অনেক সময় স্যাররা বই খুলতেই বলেন না। পরে বলেন, ‘এটা কোচিংয়ে দেখাব।’ কোচিংয়ে না গেলে আমরা পিছিয়ে পড়ি। বাধ্য হয়েই যেতে হয়।” অর্থাৎ এখানে আর স্বেচ্ছায় কোচিং করার প্রশ্ন নেই; এটি এক ধরনের অঘোষিত জোরজবরদস্তি।
স্থানীয় এক সচেতন নাগরিকের ভাষায়, “এটা শুধু কোচিংয়ের সমস্যা নয়, এটা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া। যখন শিক্ষকই জ্ঞানের বদলে ব্যবসাকে প্রাধান্য দেন, তখন শিক্ষার্থীরা শিখবে কী? ভবিষ্যতে আমরা কেমন নাগরিক তৈরি করছি?” এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামীর ভয়াবহ আশঙ্কা।
একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের সময় শিক্ষকতা ছিল ব্রত। এখন অনেকের কাছে এটা বিনিয়োগ—ক্লাসে কম দিলে কোচিংয়ে বেশি আয় হবে। এই মানসিকতা একটা পুরো প্রজন্মকে ঠকাচ্ছে।” তার কথায় ফুটে ওঠে পেশাগত নৈতিকতার গভীর অবক্ষয়।
নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নিজস্ব শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে পারবেন না এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অবহেলা করতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়মের প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। প্রশাসনের দুর্বল তদারকি আর নীরবতার সুযোগে একটি চক্র প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে এই বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফল ভয়াবহ—শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যাচ্ছে, গরিব-সচ্ছল বৈষম্য বাড়ছে, এবং মেধার বদলে টাকার জোরে টিকে থাকার এক বিকৃত সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।
আজ পীরগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থা যেন ঘুণে ধরা বাঁশ—বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ভেতরে ফাঁপা। এই অবস্থার দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই সেইসব শিক্ষকদের, যারা নিজেদের পবিত্র দায়িত্ব ভুলে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করেছেন।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.