সাকিব আহসান,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওঃ
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেখানে প্রতিদিন কয়েকশ’ মানুষ জীবনের শেষ ভরসা নিয়ে ছুটে আসে সেই প্রতিষ্ঠানটি এখন পরিণত হয়েছে এক অদ্ভুত আমলাতান্ত্রিক নাট্যমঞ্চে। চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন নয়, বরং বদলি, পদায়ন, প্রভাব ও অদৃশ্য লবিংয়ের টানাপোড়েনে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম আজ গভীর অনিশ্চয়তায়।
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছেন দুই চিকিৎসক বর্তমানে বদলিকৃত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. কামাল আহমেদ এবং পুনরায় বিতর্কিতভাবে পদায়ন পাওয়া ডা. আব্দুল জব্বার।
প্রায় চার মাস আগে ডা. কামাল আহমেদ পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হাসপাতালে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করেন, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন, সেবার মানোন্নয়নে বেশ কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ নেন। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত এই হাসপাতাল যেন নতুন করে শ্বাস নিতে শুরু করে।
কিন্তু ঠিক এই সময়েই ঘটে অদ্ভুত ঘটনা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে, বিদায়ী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এবিএম আবু হানিফ ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি হঠাৎ করেই “জরুরি” দেখিয়ে ডা. কামাল আহমেদকে পীরগঞ্জ থেকে রাণীশংকৈল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একই পদে বদলি করেন। প্রশ্ন উঠেছে যে কর্মকর্তা মাত্র চার মাসে একটি ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করাতে শুরু করেছিলেন, তাঁর বদলি কি আদৌ জনস্বার্থে?
এখানেই গল্পের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু।
পীরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এর আগে প্রায় পাঁচ বছর ধরে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ডা. আব্দুল জব্বার। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দীর্ঘ সময়ে হাসপাতালের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, সেবার মান চরমভাবে নিম্নমুখী হয়, তৈরি হয় নানামুখী প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা।
এই প্রেক্ষাপটে প্রায় চার মাস আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাঁকে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদানের নির্দেশ দেয়। বদলির প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে যোগদান না করলে তাঁকে চাকরি থেকে অবমুক্ত করা হবে।
কিন্তু তিনি সেখানে যোগদান করেননি।
বরং অবাক করা বিষয় হলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা লঙ্ঘন করে, সব নিয়মের তোয়াক্কা না করে, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তাঁকেই আবার পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহকারী সার্জন হিসেবে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্ত ঘিরেই বিস্ফোরিত হয় জনরোষ।
মঙ্গলবার হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষুব্ধ পীরগঞ্জবাসী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন গণঅধিকার পরিষদের জেলা নেতা অধ্যাপক আব্দুস সোবহান, পৌর সভাপতি আলমগীর কবীর জুয়েল, বিএনপি নেতা রাসেল রাজ, যুবদল নেতা শরিফসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
তাঁদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট,এটি শুধু একজন চিকিৎসকের বদলি বা পদায়নের প্রশ্ন নয়; এটি একটি পুরো জনপদের স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে টানাটানি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ডা. আব্দুল জব্বারের পুনরায় পদায়নের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী একটি প্রভাবশালী মহলের লবিং, যার কাছে নিয়ম, নীতিমালা, এমনকি জনস্বার্থও তুচ্ছ।
অন্যদিকে ডা. কামাল আহমেদকে সরিয়ে দেওয়াকে অনেকেই দেখছেন একটি “সংস্কারবিরোধী প্রতিক্রিয়া” হিসেবে। কারণ তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরই অনিয়মের লাগাম টানতে শুরু করেছিলেন, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনছিলেন, যা কারও কারও জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
প্রশ্ন উঠছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কীভাবে একই ব্যক্তিকে একবার অযোগ্য বিবেচনা করে সরানো হয়, আবার কয়েক মাসের মধ্যেই সব নিয়ম ভেঙে ফিরিয়ে আনা হয়? কীসের বিনিময়ে?
পীরগঞ্জবাসীর দাবি স্পষ্ট-ডা. আব্দুল জব্বারের বিতর্কিত পদায়নের আদেশ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। জনস্বার্থে ডা. কামাল আহমেদকে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহাল রাখতে হবে।
এই ঘটনা শুধু একটি উপজেলার গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য প্রশাসনের ভেতরের সেই অদৃশ্য সংকটের প্রতিচ্ছবি, যেখানে ভালো কাজ করা কর্মকর্তারা হঠাৎ “অপ্রয়োজনীয়” হয়ে যান, আর প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিরা রহস্যজনকভাবে বারবার ফিরে আসেন।
যদি এই প্রবণতা চলতেই থাকে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কোনো ব্যক্তি নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাটুকু: সরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থা।
পীরগঞ্জ আজ শুধু একজন চিকিৎসক নয়, একটি নীতির পক্ষে দাঁড়িয়েছে যেখানে যোগ্যতা, সততা ও জনস্বার্থই হবে শেষ কথা, অদৃশ্য তদবির নয়।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.