
অনুপ্রবেশকারীদের অপকর্মের কারণে দলকে দুর্নামের মুখোমুখি হতে হয় উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতাদের অনুপ্রবেশকারীদের দলে না নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
রবিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের যৌথ উদ্যোগে ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের নিহত শহীদদের স্মরণে এক আলোচনায় অংশ নিয়ে এ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই সভায় অংশ নেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘যখন কোনো দল ক্ষমতায় থাকে, তখন বিভিন্ন পক্ষ থেকে কিছু লোক ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিতে আসে। দলে যোগদানের পর তারা বিভিন্ন অঘটন ঘটায় ও অপকর্মের আশ্রয় নেয়। আর পরবর্তীতে এর দায় নিতে হয় দলকে।’
তিনি বলেন, ‘এজন্যই যারা সামরিক শাসকদের হাতে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক কর্মী বা যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে এবং যুদ্ধাপরাধের মদদ দিয়েছে তারা যেন আমাদের দলে না আসে।’
‘কারণ, তারা দলে অনুপ্রবেশ করে দলের ক্ষতি করে এবং বিভিন্ন অঘটন ঘটায়। তারা আমাদের ভালো নেতাকর্মীদের হত্যা করে। দলে ভেতর কোন্দল শুরু হলে দেখা যায়, যারা উড়ে এসে জুড়ে বসেছে তারাই ওই কোন্দলের জন্য দায়ী,’যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অনুপ্রবেশকারীরা এতো ভালো ব্যবহার করে যে, আমাদের কোনো কোনো নেতা তার দল ভারী করার জন্য তাদেরকে কাছে টেনে নেয়। কিন্তু অনুপ্রবেশকারীদের কাছে টেনে নেয়া দলের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ।
আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের একমাত্র দল যারা বিপুল জনসমর্থন নিয়ে তৃণমূল পর্যায়েও সুসংগঠিত রয়েছে উল্লেখ করে, দলের নেতাকর্মীদের সর্বদা আদর্শের ভিত্তিতে দল গড়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
জিয়াউর রহমানকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘যারা সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতায় আসে তারা গণতন্ত্র দিতে পারে না। তবে আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবী এবং গণ্যমান্য ব্যক্তি রয়েছেন যারা সামরিক শাসন বা জরুরি অবস্থায় গণতন্ত্রের সন্ধান করছেন।’
‘জরুরি অবস্থা জারি হলে তারা গণতন্ত্র খুঁজে বেড়ায় অথবা স্বৈরশাসকরা ক্ষমতায় এলে তারা গণতন্ত্রের স্বাদ পায়। কিন্তু তারা গণতান্ত্রিক পরিবেশে গণতন্ত্র খুঁজে পায় না। এর মানে হলো তারা মূলত চাটুকার প্রকৃতির,’ যোগ করেন শেখ হাসিনা।
যারা ক্ষমতা দখল করে তারা হঠাৎ করেই চাটুকারদের ভাড়া করে নেন এবং বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ ব্যবহার হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বা গণতান্ত্রিক প্রবণতা যখন বিরাজ করে তখন ঐসকল বুদ্ধিজীবীদের কোনো মূল্য নেই। গণতান্ত্রিক সরকার তাদের ব্যবহার করবে না, তাতে যতোই তারা বুকে লিখে রাখুখ না কেন যে, ‘আমাকে ব্যবহার করুন।’ এরপরই তারা চেঁচিয়ে বলে যে দেশে গণতন্ত্র নেই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে আশুরা তথা মহররমের ১০ তারিখ। এদিনে নবী (সা.) এর নাতি ইমাম হোসেনকে কারবালায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তারা ন্যায়ের পথে ছিলেন। কারবালার এই হত্যাকাণ্ডে নারী-শিশুদের হত্যা করা হয়নি। কিন্তু ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি কিংবা মিন্টো রোডে কোথাও নারী-শিশু রক্ষা পায়নি। তবুও ১৫ আগস্টের এ ঘটনার সঙ্গে কারবালার ঘটনার যেন এক অদ্ভুত মিল রয়ে গেছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতার অপরাধটা কী ছিল- একটি দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, একটি জাতিকে আত্ম-পরিচয়ের সুযোগ করে দিয়েছেন? এটাই কী তার অপরাধ ছিল?’
পাকিস্তান নামের যে রাষ্ট্রটি হয়, সেই রাষ্ট্রের সৃষ্টির পেছনেও তো তার (বঙ্গবন্ধুর) অনেক অবদান ছিল জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে তিনি তো পশ্চিম পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছিলেন। শেরে-বাংলা থেকে সোহরাওয়ার্দী সবাই এই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তাদের একজন কর্মী হিসেবে তিনি কাজ করেছেন।’
এ সময় ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা (বঙ্গবন্ধুর খুনিরা) এই সাহস কোথায় পেয়েছিল। তাদের নিজের কথায়, বিবিসিকে কর্নেল রশীদ ও কর্নেল ফারুকের দেওয়া ইন্টারভিউ এবং বিভিন্ন বিদেশি পত্রিকায় তারা যে ইন্টারভিউ দিয়েছিল, সেখানে তারা নিজেরা স্বীকার করেছিল- তাদের সঙ্গে জিয়াউর রহমান আছে, জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে তারা সব ধরনের সহযোগিতা পেয়েছিল।’
‘আর সেইসঙ্গে বেইমানি-মোনোফেকি করেছিল মোশতাক, যিনি আবার বাবার কেবিনেটেই বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। সে সম্পূর্ণভাবে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। ১৫ আগস্টের পর মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছিল। মোশতাকের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছিল জিয়াউর রহমান’ যোগ করেন শেখ হাসিনা।
উল্লেখ্য, হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (র.) ও তার পরিবারবর্গ কারবালার প্রান্তরে শাহাদত বরণ করেন। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তাদের এ আত্মত্যাগ মুসলিম উম্মাহর জন্য এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরের আলো ফোটার আগেই বাঙালি জাতিকে মুক্তির আলো দেখানো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল চক্রান্তকারী কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য। ঘাতকেরা সেদিন নারী ও শিশুদেরও রেহাই দেয়নি, যা ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
সূত্র-ইউ.এন.বি