
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে বসবাস কারী একজন মুসলিম নারী উগ্র খ্রিষ্টান তরুণদের একটি দল কর্তৃক ছিনতাই এবং নির্মম ভাবে আঘাতের শিকার হন। নিউইয়র্ক শহরের পুলিশ দপ্তর এবং স্থানীয় ব্রোনক্স ডিস্ট্রিকের আইন কর্মকর্তার দপ্তর জানিয়েছেন যে, ছিনতাইয়ের শিকার এই নারী যদি ঘৃণা মূলক আক্রমণের দৃশ্য সম্বলিত ভিডিও চিত্র না সরবরাহ করতেন তবে হয়ত এ বিষয়টি প্রমাণিত হতনা।
২২ বছর বয়সী ফাতোউমাতা কামারা জানান, কর্তৃপক্ষ তিনি একজন মুসলিম হওয়ায় শুরুতে এ বিষয় কে গুরুত্ব দেয় নি এবং আক্রমণের শিকার হয়ে আমি থেঁতলে যাওয়া নাক ও আহত মাথা নিয়ে কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে এই ঘটনা সম্পর্কে তদন্ত করার জন্য তাদের কে ভিডিও দৃশ্য খুঁজে বের করে দিয়েছি।
নিউইয়র্ক শহরের পুলিশ দপ্তর জানিয়েছে ফাতোউমাতা কামারা একজন মুসলিম তিনি ব্রোনক্স এ বসবাস করেন এবং তিনি হিজাব পরিধান করেন। পুলিশ দপ্তর আরো জানায় যে, তারা ফাতোউমাতা কামারার উপর আক্রমণের মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করেছেন শুধুমাত্র এই ঘটনার ভিডিও দৃশ্য থাকাতে।
ফাতোউমাতা কামারা বার্তা সংস্থা হাফিংটনপোষ্ট কে বলেন, ‘আমি আমার নিজেকে বুঝিয়েছি যে, আমার মামলাটি অন্যদের মত করে আমি পরিত্যক্ত হতে দিব না। সেই রাতে আমার সাথে যা কিছু হয়েছে তার সুষ্ঠ বিচার আমি দেখেই ছাড়বো।’
প্রকৌশল বিজ্ঞানের উপর ডিগ্রী ধারী ফাতোউমাতা কামারা কে চলতি বছরের মে মাসের ২৯ তারিখ পুলিশ দপ্তর থেকে জানানো হয়েছিল যে, উপযুক্ত তথ্য প্রমাণের অভাবে তার মামলাটি স্থগিত করে রাখা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছর সমূহে নিউইয়র্ক শহর সহ পুরো যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে মুসলিম বিরোধী ঘৃণা মূলক আক্রমণ বেড়ে চলেছে। ‘Council on American-Islamic Relations’ নামের সংগঠনটির নিউইয়র্ক শাখা কর্তৃক পরিচালিত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ২০১৬ সালের পর থেকে নিউইয়র্ক শহরে মুসলিম বিরোধী আক্রমণের সংখ্যা ৭৪ শতাংশ বেড়েছে।
ফাতোউমাতা কামারার মত যে সমস্ত নারী হিজাব পরিধান করেন তারা প্রথমেই এসব আক্রমণের মুখোমুখি হন কারণ হিজাবের মাধ্যমে তাদের মুসলিম পরিচয় ফুটে উঠে।
নিউইয়র্ক মানবাধিকার কমিশন জানিয়েছে যে, ব্রোনক্সে বসবাসরত কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম নারীরা মুসলিম বিরোধী আক্রমণের প্রধান লক্ষবস্তুতে পরিণত হয়েছেন।
কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিমদের প্রতি ৫ জন নারীর ১ জন মুসলিম বিরোধী আক্রমণের শিকার হওয়র অভিজ্ঞতা রয়েছে।
নিউইয়র্ক সিটি কলেজ অফ টেকনোলজি এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে ফাতোউমাতা কামারা নিজের ঘরে ফিরে আসার জন্য তিনি একটি বাসে উঠেন।
তিনি যখনই বাসে উঠে বসছিলেন ঠিক তখনই অন্তত ১০-১২ জন পুরুষ এবং নারী যাদের মধ্যে অনেকেই বয়সে তরুণ তারা কামারা কে বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করা শুরু করে এবং তাকে উদ্দেশ্য করে বিদ্রূপাত্মক বাক্য বলতে থাকে।
ভিডিও চিত্রে দেখা যায় যে, আক্রমণ কারীরা কামারা কে উদ্দেশ্য করে সূর্যমুখী বীজ ছুড়ে মারে এবং তাকে ‘বধির, কালো মাগি’ ইত্যাদি রকমের যৌন উত্তেজক গালি দেয়া শুরু করে। তারা এমনকি তাকে ‘বোকা হিজাব ধারী’ বলেও আখ্যায়িত করে।
কামারা যখন বাস থেকে নেমে গিয়েছিলেন আক্রমণ কারীদের দল তার সাথে সাথে বাস থেকে নেমে যায়। ভিডিও তে দেখা যায় যে, কামারাকে ধাক্কা দেয়া হচ্ছে, ঘুষি মারা হচ্ছে এবং লাথি দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন কামারার হিজাব খুলে নেয়।
একজন পথচারী আক্রমণ কারীদের এরূপ আচরণে বাধা দিলে কিছু সময়ের জন্য তারা কামারার উপর অত্যাচার থামিয়ে দেয় এবং পরে আবারো তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এরই মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পৌছায়। কিছু আক্রমণ কারী দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও পুলিশ তিন জন আক্রমণ কারীকে গ্রেপ্তার করে সক্ষম হয়। কিন্তু পরবর্তীতে আটক কৃত তিন জনকে কোনো ধরণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা ব্যতীত ছেড়ে দেয়া হয়।
আহত কামারা কে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তার ব্যাগের মধ্যে থাকা ৫০০ ডলার, তার সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড, তারা রাষ্ট্রীয় পরিচয় পত্র এবং তার পাসপোর্ট চুরি হয়ে যায়।
ফাতোউমাতা কামারার আইনজীবী আহমেদ মোহাম্মদ কর্তৃপক্ষ এই মামলার প্রতিবেদন গুরুত্বের সাথে নেয় নি।
তিনি বলেন, ‘এরকম একটি মামলা যা শুধুমাত্র একটি অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় বরং তা একটি ঘৃণা মূলক আক্রমণের সাথে যুক্ত। আমাদের নিকট উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ রয়েছে। আমাদের মক্কেল তদন্ত কারী দলকে শুধু মাত্র কিছু প্রমাণ প্রদান করেন নি বরং তিনি তাদের কাজ নিজে করে দিয়েছেন। নিউইয়র্ক পুলিশ দপ্তর আমাদের মক্কেলের জীবনের ঝুঁকি কে অতোটা গুরুত্বের সাথে নেয় নি।’
মে মাসের ১৪ তারিখে কামারা তদন্ত কারী দলের নিকট পুলিশ প্রতিবেদনের একটি কপি তাকে সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু তাকে তা দেয়া হয় নি। তিনি জানান, তার মামলা টির তদন্ত কারী কর্মকর্তার সাথে তিনি দুবার সাক্ষাত করতে চেয়েছেন কিন্তু তিনি তা করতে পারেন নি।
এর পর কামারা ঘটনা স্থলে একটি ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের নজরদারি ক্যামেরা দেখতে পান যেখানে তাকে আক্রমণ কারীরা নির্মম ভাবে পিটিয়েছিল। তিনি প্রতিষ্ঠানটির মালিকের সাথে দেখা করেন এবং ঘটনার ভিডিও চিত্র সংগ্রহ করেন। কামারা এই ভিডিও চিত্র পুলিশ দপ্তর এবং গণমাধ্যমের নিকট প্রেরণ করেন।
গণ মাধ্যমে ভিডিওটি প্রচারিত হলে শেষ অবধি পুলিশ কামারার সাথে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য দেখা করে।
তিনি আশা করেন, এই ভিডিওর মাধ্যমে পুলিশ আক্রমণ কারীদের ধরতে পারবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সমর্থনের অভাবে তিনি তাদের উপর ভরসা করতে পারছেন না।
তিনি বলেন, ‘এখন আমি একা একা বাহিরে বের হতে ভয় পাই। ওই ঘটনার পর আমি জানি না আমার সাথে আবার কি ঘটতে চলেছে। আমি শুধু মাত্র আশা করি যে, আমার কমিউনিটির কোনো সদস্যের সাথে এমনটি কখনো ঘটবে না।’
সূত্র: হাফপোস্ট ডট কম।