
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিন্দু সাম্পাথ তার নাতনীর হাঁসি সম্বলিত একটিই ভয়েস মেইল বার বার শুনছেন যাকে তিনি কখনো দেখেন নি। তিনি কল্পনা করছেন হয়ত তার নাতনীর সাথে আর কখনো দেখা হবে না।
সাম্পাথের কন্যা নিমিশা আজ থেকে তিন বছর পূর্বে তার নিজ দেশ ভারত ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ভারত ছাড়ার আগে নিমিশা তার নিজ রাজ্য কেরালার উত্তর দিকে অবস্থিত একশত মাইল দূরের একটি ডেন্টাল বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল।
সেখানে নিমিশার সাথে তার ভবিষ্যৎ স্বামীর দেখা হয়। নিমিশা হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে আর তার স্বামী খ্রিষ্টান ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলছে তারা দুজনেই ISIS এ যোগ দিয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে ২৯ বছর বয়সী ডেন্টিস্ট নিমিশা বর্ত্তমানে আফগানিস্তানে অবস্থান করছে। তিনি এবং তার স্বামী ভারতীয় কর্তৃপক্ষের জন্য তালিকা ভুক্ত সন্ত্রাসী যাদের বিরুদ্ধে ISIS এর সদস্য হওয়ার মাধ্যমে ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ভারতের থিংক ট্যাংক ‘Observer Research Foundation’ এর মতে, নিমিশা এবং তারা স্বামী হচ্ছে কেরালা রাজ্যের কয়েক ডজন তরুণ তরুণীর মত যারা বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে ISIS তে যোগ দান করেছে।
ভারতের বেশিরভাগ সন্ত্রাসী হামলা যেমন, ২০০৮ সালের মুম্বাই আক্রমণ ইত্যাদির সাথে ভারত-পাকিস্তান অথবা কাশ্মীর সংঘাত জড়িত বা দেশটির অভ্যন্তরীণ কার্ল মার্ক্স বাদী গেরিলারা জড়িত। কিন্তু ইউরোপ বা আমেরিকার মত ভারত এর পূর্বে আন্তর্জাতিক জিহাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় নি। একই সাথে চলতি বছরে ইস্টার সানডের দিন বোমা হামলার পূর্বে শ্রীলঙ্কাতেও আন্তর্জাতিক জঙ্গিদের দেখা যায় নি।
শ্রীলঙ্কান কর্তৃপক্ষ ইস্টার সানডের দিন আক্রমণ সম্পর্কিত তদন্ত দক্ষিণ ভারতেও সম্প্রসারণ করার আহ্বান জানিয়েছেন তাদের দাবী মতে আক্রমণের মাস্টার-মাইন্ড ভারতের দক্ষিণের একটি রাজ্যে আক্রমণের কিছুদিন পূর্বেই সফর করেছিল।
একই সাথে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনার দায়ে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ভারতে দক্ষিণাঞ্চলে একজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ ভারত এবং ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল সমূহ আন্তর্জাতিক জঙ্গিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
নয়া দিল্লী ভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘Institute for Defence Studies and Analyses’ এর গবেষক এস.ডি. মুনি বলেন, ‘এটি ISIS এর প্রেরিত কোনো বার্তা হতে পারে। তারা বলতে চায়, দেখ আমরা এখনো বেঁচে আছি এবং তোমাদের উপর হামলা করছি। যদি তোমরা আমাদের সিরিয়া থেকে বের করে দিতে চাও তবে শ্রীলঙ্কায় আমাদের উপস্থিতি জানান দিব। আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের উপস্থিতি জানান দিব।’
ভারত ত্যাগের কিছুদিন পরেই নিমিশা তার নিজের নাম পরিবর্তন করে ফাতিমা ইসা রেখেছিল এবং তার মায়ের নিকট আফগানিস্তান থেকে টেক্সট এবং অডিও বার্তা প্রেরণ করেছিল। তারা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা থেকে বিরত থাকেন। বিন্দু সাম্পাথ জানিয়েছেন যে, তিনি খুব বেশী প্রশ্ন করেন না। তিনি শুধুমাত্র তার নাতনীর কণ্ঠস্বর শুনতে চান।
আফগানিস্তানে ফাতিমা ইসা একটি কন্যা শিশু জন্ম দেন। তিনি তার মায়ের নিকট তার কন্যার আলোক চিত্র এবং হাঁসি সম্বলিত অডিও বার্তা প্রেরণ করেন।
৫২ বছর বয়সী বিন্দু সাম্পাথ বলেন, ‘আমার মেয়ে ISIS এ যোগ দিয়েছে আমি এমন সম্ভাব্যতার কথা শুনতে চাই না। তাহলে আমি হতাশ হয়ে আত্মহত্যা করতে পারি। শুধুমাত্র একজন মা জানে আমি কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছি। আমি বলি, সৃষ্টিকর্তা দয়া করে তাকে সাহায্য করুন, দয়া করে তা রক্ষা করুন।’
ISIS বিশ্বব্যাপী মানুষজনদের মধ্যে উগ্রতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ভারতের মত দেশে বিন্দু সাম্পাথের মত মায়ের জন্য এমন গল্প একেবারেই কম শোনা যায়। এমনকি ১৮০ মিলিয়ন মুসলিমের দেশ ভারতে উগ্র বাদের কথা খুব কম শোনা যায়।
কেরালা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘Islamic and West Asian Studies’ এর অধ্যাপক আশরাফ কাডাক্কাল বলেন, ‘যখন মহাত্মা গান্ধী তারা স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করেছিলেন তখন ভারতীয় মুসলিমরা সেই আন্দোলনের অন্যতম অঙ্গ হয়ে উঠে এবং সময়ে সময়ে রাজনৈতিক ভাবে এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভারতীয় মুসলিমরা এ দেশের মূল ধরার সাথে মিশে গিয়েছে।’
কিন্তু তার মতে পরিস্থিতি এখন পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে।
এর পেছনে সম্ভাব্য যে বিষয়টি কাজ করছে তা হলো: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির কার্যকলাপ যা দেশটির সবচেয়ে বড় ধর্মের মধ্যে উগ্রবাদী ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ফলে ভারতের মুসলিম এবং অন্যান্য সংখ্যা লঘুরা নিজেদের কে বঞ্চিত ভাবছে। হিন্দুইজম কে ভারতের কেন্দ্রীয় আদর্শ করার প্রচেষ্টায় কাডাক্কালের মতে বিজেপি মুসলিমদের কে ‘অন্য’ সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করছে।
কাডাক্কাল বলেন, ‘সুতরাং এই ‘অন্য’ সম্প্রদায় ভুক্ত করণ প্রচেষ্টা আসলে মুসলিম এবং হিন্দুদের মধ্যে বিভেদের বাতাস বইয়ে দেয়া ছাড়া অন্য কিছু নয় যা উগ্রপন্থী দল সমূহের জন্য অনুকূল আবহাওয়া তৈরী করতে পারে।’
কাডাক্কাল আরো বলেন, ‘ভারতের অনেক রাজ্য থেকে মুসলিমরা মধ্য প্রাচ্য শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যায় এবং তারা নতুন আদর্শ নিয়ে এখানে ফিরে আসে। তারা তখন ভারতীয় আবহাওয়া কে ইসলামিক নয় এমন ভাবতে শুরু করে।
এখানে আপনি নারীদের মুখ খোলা দেখবেন, তারা সিনেমা দেখতে যায়, নাচ, গান এবং নাটকে অংশ নেয়।’
আর কেরেলা রাজ্যের আবহাওয়া এভাবে ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে। শুধুমাত্র কাসারাগদ ডিস্ট্রিকের ১৫ জন মানুষ তিন বছর পূর্বে ISIS এ যোগ দিয়েছে আর অনেক নারী বর্ত্তমানে পুরো মুখ ঢেকে রাখে এমন পর্দা পরিধান করা শুরু করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র মধ্য প্রাচ্যের প্রভাবের কারণে ভারতীয় মুসলিমরা উগ্রপন্থী হচ্ছেন না কারণ তারা ভারতীয় সমাজের মূল থেকেই মিশে রয়েছেন বরং হিন্দু জাতীয়তা বাদের সাম্প্রতিক উত্থান উগ্র পন্থার পেছনে কাজ করছে।
মধ্য প্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণে অর্থ আয় করে কাসারাগদ রাজ্যে সাদা বালুর সমুদ্র তটের নিকটে একটি বিশাল মার্বেল পাথরের তৈরী ভিলা নির্মাণ করা হয়েছে।
আর এই ভিলার সামনে একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে মধ্য প্রাচ্য থেকে অর্থ আয় কারী সন্তানদের পিতা বসে রয়েছেন। তাকে খুবই ভগ্ন হৃদয়ের মনে হচ্ছে। তিনি বর্ণনা দিয়ে বলেন, তরা দুই সন্তান এবং একজন ভাগ্নে কিভাবে মধ্য প্রাচ্য এ শ্রীলঙ্কায় এক উগ্র পন্থীর সাথে মিলত হয়। ওই ব্যক্তি তার সন্তান এবং ভাগ্নে কে আফগানিস্তান নিয়ে যায়।
আবদুল রাহমান নামের কেরেলা রাজ্যের এই ব্যবসায়ী পিতা যিনি এর পূর্বে মধ্য প্রাচ্যে কাজ করেছিলেন তিনি বলেন, আমার তরুণ সন্তানরা প্রথমে ইন্টারনেট এবং বন্ধুদের দ্বারা উগ্রপন্থায় জড়িত হয়। পরবর্তীতে রাশিদ নামের একজন শিক্ষক দ্বারা আমার সন্তানেরা মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়।
আবদুল রাহমানের গ্রামে এর পূর্বে খুব কম মসজিদ ছিল এবং সেখানে আফগানিস্তান থেকে আসা একজন সুফি সাধক একটি খানকা নির্মাণ করেন যা ৪০০ বছর পুরনো। বর্ত্তমানে সেখানে কয়েক ডজন মসজিদ নির্মিত হয়েছে এবং গ্রামে অন্তত ৩,৭০০ মুসলিম পরিবার বসবাস করে।
আবদুল রাহমান ভারত ছেড়ে যাওয়া তার সন্তানদের সাথে কোনো ধরণের বার্তা আদন প্রদান করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। তার বড় ছেলে এখনো তাদের প্রতিবেশীদের সাথে বার্তা আদন প্রদান করেন। তার বড় ছেলে এও জানিয়েছে যে, আমেরিকার একটি ড্রোন হামলার ফলে তার ছোট ভাই এবং তার স্ত্রী ও শিশু সন্তানের মৃত্যু হয়েছে।
কেরালা রাজ্যের দাদী বিন্দু সাম্পাথের মত যিনি তার অদেখা নাতনীর কণ্ঠস্বর শোনার জন্য আকুল হয়ে থাকেন তিনি নিজেও আবদুল রহমানের সন্তানদের মত আফগানিস্তানে তার নিজের মেয়ের কঠিন পরিণতি হতে পারে এ ভয়ে ভীত থাকেন।
বিগত ছয় মাস পূর্বে তার কন্যার টেলিফোন নীরব হয়ে যায়। গত বছরের নভেম্বর মাসে তার কন্যা তার নিকট সর্বশেষ বার্তা পাঠায়। আর এর পর থেকে তাদের সাথে আর যোগাযোগ হয় নি।
সূত্র: এনপিআর ডট ওরগ।