
ঘানার প্রধান ইমাম খুব একাট বেশি কথা বলেন না, কিন্তু মানুষের মধ্যে কীভাবে আলোচনা তৈরি করতে হয় তা ১০০ বছর বয়সী এই মুসলিম ধর্মীয় নেতা ভালই জানেন। একটি ক্যাথলিক গির্জার কার্যক্রমে অংশ নিয়ে সেদেশে দারুণ আলোচনার জন্ম দিয়েছেন তিনি।
ইস্টার উদযাপনের সময় ইমাম শেখ ওসমান শারুবুতুর একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যায় যে তিনি আক্রার ক্রাইস্ট দ্য কিং ক্যাথলিক চার্চের ইস্টার সানডের অনুষ্ঠানে বসে আছেন। খবর বিবিসি বাংলার
ঘানার সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান মুফতি সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের যে আদর্শ প্রচার করে এসেছেন তা বজায় রাখার উদ্যোগ হিসেবেই গির্জায় উপস্থিত ছিলেন।
শ্রীলংকায় যেদিন ইসলামপন্থী জঙ্গিদের বোমা হামলায় ২৫০ জনের বেশি মানুষ মারা যায় সেদিনই গির্জার প্রধান যাজক অ্যান্ড্রু ক্যাম্পবেলের পাশে বসে থাকার ছবিটি তোলা হয়।
সামাজিক মাধ্যমে ইমামের ছবিটিকে যারা সাধুবাদ জানিয়েছেন তাদের অনেকেই ইমামকে অন্ধকারে প্রজ্জ্বলিত আলোকশিখা বলে অভিহিত করছেন। তবে ইমামের এই পদক্ষেপে সবাই যে খুশী হয়েছেন, তাও নয়।
কিছু কিছু সমালোচক মুসলিম হয়ে গির্জায় উপাসনার সময় উপস্থিত থাকার বিষয়টিকে কদর্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
শেখ শারুবুতু বলেছেন, তিনি উপাসনা করছিলেন না বরং মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের চিন্তা থেকে তাদের উপাসনার সময় উপস্থিত ছিলেন মাত্র।
শেখ শারুবুতুর মুখপাত্র আরেমেয়াও শাইবু বলেন, ইসলাম বিদ্বেষপূর্ণ, সংঘাতপূর্ণ বা ঘৃণার ধর্ম – মানুষের মধ্যে থাকা এরকম ঢালাও ধারণা পাল্টে এটি যে আসলে শান্তি, ক্ষমা ও ভালবাসার ধর্ম, তা প্রচারের প্রয়াস থেকেই ইমামের এরকম কার্যক্রম।
জনপ্রিয় মুসলিম নেতা
গত ২৬ বছর ধরে শেখ শারুবুতু ঘানা’র শীর্ষ মুসলিম যাজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ইসলাম শান্তি এবং ক্ষমার ধর্ম – ঘানার রাজধানীর কেন্দ্রীয় মসজিদে শুক্রবারের সাম্পাহিক ভাষণে তিনি সবসময়ই এ বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে এসেছেন।
তার ভাষণে বস্তুবাদী জীবনযাপন ত্যাগ করতেও সবসময় উদ্বুদ্ধ করে এসেছেন তিনি।
অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এলাকা ফাদামায় তার বাসভবনের দরজা সবসময় উন্মুক্ত থাকে বলেও সবসময় বলে এসেছেন তিনি।
বহু বছর ধরে ঐ এলাকার বাসিন্দাদের অনেকে প্রতিদিন সকালে তার বাড়ির এলাকা থেকে পানি সংগ্রহ করতে জড়ো হয়।
আবার প্রতি রাতে তার বাসা থেকে তৈরি খাবার সংগ্রহ করতে জড়ো হয় অনেক মানুষ।
ইসলামিক নেতারা আদর্শগতভাবেই এই ধরণের দান করে থাকেন। কিন্তু শেখ শারুবুতুর সমর্থকরা বলেন যে দানের ক্ষেত্রে তার কার্যক্রম বর্তমান যুগের যে কোনো নেতার তুলনায় নজিরবিহীন।
তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেশে এবং দেশের বাইরে পড়ালেখা চালানোর জন্য শত শত শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা করেছেন।
দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শিক্ষা তহবিলও গঠন করেছেন তিনি।
খ্রিস্টান অধ্যুষিত ঘানায় মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৮% হলেও সেদেশে কখনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এই অসাম্প্রদায়িকতার ধারা যেন অব্যাহত থাকে সেলক্ষ্যে ইমাম শেখ শারুবুতু নিজে সবসময়ই সচেতন থাকেন।
শেখ শারুবুতু তার দর্শন প্রচারের মাধ্যম হিসেবে সবসময় তার প্রিয় কোরানের বাণীগুলোকেই ব্যবহার করেছেন।
সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানপূর্ণ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে একে অন্যের সাথে ন্যায্য আচরণ করার গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, উদারতা প্রকাশে এবং যারা তোমার সাথে ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ করেনি বা তোমাকে ঘর থেকে বিতাড়িত করেনি তাদের সাথে ন্যায্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে আল্লাহ কখনো তোমাকে বারণ করেননি। ন্যায্য ব্যবহার করা ব্যক্তিদের আল্লাহ ভালবাসেন।
আক্রায় থাকাকালীন সময়ে তরুণ মুসলিম শিক্ষক হিসেবে তার ছাত্রদের মধ্যে এই আদর্শই প্রচার করার চেষ্টা করেছেন শেখ শারুবুতু।
১৯৯৩ সালে ৭৪ বছর বয়সে ঘানার প্রধান ইমাম হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ইতিহাস তৈরি করেন তিনি। তার আগে ঘানায় এই পর্যায়ে কোনো মুসলিম নেতা ছিল না।
১০০ বছর বয়সে শেখ শারুবুতুর রেকর্ড
ব্যক্তিগতভাবে ৫ হাজারের বেশি বিয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন
৪ হাজারের বেশি শেষকৃত্যের উপাসনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন
১০ হাজাররে বেশি শিশুদের নামকরণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন