
বাংলাদেশে সদ্যসমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখলেও ভোটে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তার ‘স্বচ্ছ’ তদন্ত চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সব পক্ষকে নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতের প্রত্যাশা কথা জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
বিবৃতিতে নির্বাচনের আগে হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতার অভিযোগ ওঠার বিষয়টি তুলে ধরা হয়, যাতে বিরোধী জোটের অনেক প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের প্রচার বিঘ্নিত হয়।
নির্বাচনের দিন অনিয়মের কারণে অনেকে ভোট দিতে পারেনি বলে অভিযোগের খবরে উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা বলছে, এর মধ্য দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
নির্বাচনের পর এখন সহিংসতা এড়ানোর পরামর্শ দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনুরোধ থাকবে, যেন তারা সব পক্ষকে নিয়ে গঠনমূলকভাবে অনিয়মের অভিযোগগুলো নিয়ে কাজ করে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের উপ-মুখপাত্র রবার্ট পালাদিনো বলেন, ৩০ ডিসেম্বর সংসদীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়া বাংলাদেশের কোটি কোটি ভোটারের প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্র। একইসঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় সব দলকেও ধন্যবাদ জানায়। ২০১৪ সালে নির্বাচন বয়কট পরিস্থিতির পর এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে দেখছে।
সফলভাবে নির্বাচন আয়োজনের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনা পুনঃনির্বাচিত হওয়ায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ভবিষ্যত ও গণতান্ত্রিক উন্নয়নে গভীরভাবে বিনিয়োগ করতে চায়। পালাদিনো বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া, অনেক বাংলাদেশিও মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এই মর্মে আমরা বলতে চাই যে, নির্বাচনের আগে আমরা হয়রানি ও সহিংসতার নির্ভরযোগ্য খবর পেয়েছি। এতে করে অনেক বিরোধীদল ও তাদের সমর্থকদের স্বাধীনভাবে সভা, মিছিল ও প্রচারণা কঠিন হয়ে যায়। তারা আরও জানান, নির্বাচনের দিন কিছু অনিয়ম ও ভোটারদের ভোটদান থেকে বিরত রাখার খবরে তারা উদ্বিগ্ন। এতে করে নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে জানান তারা।
রবার্ট পালাদিনো বলেন, আমরা সবপক্ষকে সহিংসতা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানাই এবং নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করি, যেন সবাইকে নিয়ে অনিয়মের দাবিগুলো খতিয়ে দেখা হয়।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নতি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব রেকর্ড রয়েছে। আমরা ক্ষমতাসীন সরকার ও বিরোধীদলকে সঙ্গে নিয়েই কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে চাই।
ব্রাসেলস থেকে ইইউর বিবৃতিতে বলা হয়, ভোটারদের উপস্থিতি এবং বিরোধীদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের স্পিহার প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু তাতে ছায়া ফেলেছে ভোটের দিনের সহিংসতা এবং এই প্রক্রিয়ায় সবার সমান সুযোগ নিশ্চিতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বাধাও বিদ্যমান ছিল।
ইইউ বলেছে, এখন ভোট পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের উচিৎ হবে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, ‘পূর্ণ স্বচ্ছতার’ সঙ্গে তা পরীক্ষা করে দেখা।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড বিবৃতিতে বাংলাদেশের নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণে সন্তোষ জানিয়ে বলেছেন, অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য কিছু অভিযোগ তার গোচরে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিরোধী জোটের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার, তাদের প্রচারে বাধা, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি। নির্বাচন নিয়ে যত অভিযোগ এসেছে, তার সবগুলোর পূর্ণ ও স্বচ্ছ তদন্ত চেয়েছেন তিনি।
মার্ক ফিল্ড বলেন, এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিৎ, দেশের জনগণের স্বার্থে একসঙ্গে বসে নিজেদের বিরোধগুলো মিটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ বের করা। নির্বাচনের দিন সহিংসতায় অনেকের প্রাণহানিতে উদ্বেগও জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী।
গত রোববার একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়। ভোটের দিন সহিংসতায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়। এ নির্বাচনে তিনশটির মধ্যে মাত্র ৭টি আসন পাওয়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভোট ডাকাতির অভিযোগ তুলে পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলেছে, তবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা।
অন্যদিকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এবং নিজেদের কারণেই ভরাডুবি হয়েছে বিএনপি ও তাদের মিত্রদের।