
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার ঘটনায় যে খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমান সরাসরি জড়িত, সে বিষয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই।
১৪ বছর আগের এ বর্বর হামলার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গত মঙ্গলবার সকালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠানে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। এর আগে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের যে জায়গায় সেদিন ওই হামলা হয়েছিল, সেখানে নির্মিত অস্থায়ী বেদিতে ফুল দিয়ে সেদিনের হতাহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের যে চেষ্টা, এর সঙ্গে বিএনপি যে একেবারে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, খালেদা জিয়া, তাঁর ছেলেরা যে জড়িত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের যেকোনো সমাবেশের নিরাপত্তা বজায় রাখতে স্বেচ্ছাসেবক এবং ছাত্রলীগ নেতা ও কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপ দায়িত্ব পালন করে থাকে। তারা সাধারণত পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন ভবনের ছাদ থেকে এ দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু ওই দিন তাদের (স্বেচ্ছাসেবকদের) সমাবেশের আশপাশের কোনো ভবনের ছাদে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে কারা এ হামলায় জড়িত।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, হামলার সময় সেখানে উপস্থিত সেনা গোয়েন্দা সংস্থার এক সদস্য তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে ফোন করে এখানে কী হচ্ছে জানতে চাইলে তাঁকে ধমক দিয়ে সেখান থেকে সরে যেতে বলা হয়। যেসব পুলিশ কর্মকর্তা একটু সাহায্য করতে চেয়েছেন তাঁদের সরকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে তিরস্কার করে সেখান থেকে সরে যেতে বলা হয়। হতাহতদের সাহায্যে এগিয়ে না এসে পুলিশ বরং যারা সাহায্য করতে এসেছিল, তাদের ওপর টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও বেধড়ক লাঠিপেটা করে খুনিদের নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
সারা দেশে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বোমা সন্ত্রাস এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। সেই হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং মরহুম রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মানবঢাল রচনায় শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও গ্রেনেডের শব্দে তাঁর শ্রবণশক্তিতে মারাত্মক সমস্যা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এত মানুষ হতাহত হলো; কিন্তু সেটা নিয়ে সংসদে সে সময় কোনো কথা বলতে দেওয়া হয়নি। কেউ কথা বলতে গেলেই মাইক বন্ধ করে দেয় আর সেটা নিয়ে নির্মম ব্যঙ্গোক্তি এবং হাসি-তামাশা-ঠাট্টা করে। কোনো শোক প্রস্তাবও আনতে দেওয়া হয়নি। এমনও অপপ্রচার চালানো হয়, এমনকি সংসদেও বলা হয়েছে, আমি নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড এনে এই হামলা চালিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী এ সময় খালেদা জিয়া ও বিএনপি নেতাদের দেওয়া বক্তব্যগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এর কয়েক দিন আগেই খালেদা জিয়া ও বিএনপি বলেছিল, হাসিনা প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা, বিরোধী দলের নেতাও হতে পারবে না। আর আওয়ামী লীগ আগামী ১০০ বছরেও ক্ষমতায় যেতে পারবে না। কারণ আওয়ামী লীগকে গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করাই ছিল তাদের পূর্বপরিকল্পনা।’ তিনি বলেন, ‘কোটালীপাড়ায় আমার সমাবেশে ৭৬ কেজি ও ৮৪ কেজি ওজনের দুটি বোমা পুঁতে রাখার আগেও বিএনপি ও তাদের নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছিল, আমাকে নাকি ১৫ই আগস্টের ভাগ্যই বরণ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এ ধরনের একটি নৃশংস ঘটনা ক্ষমতায় থেকে বিএনপি-জামায়াত জোটই ঘটিয়েছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
শেখ হাসিনা বলেন, ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর থেকেই এর আলামত সংরক্ষণ না করে আলামত ধ্বংসের একটি প্রচেষ্টা বিএনপি-জামায়াতের ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত যে আর্চেস গ্রেনেড সেদিন ছোড়া হয়েছিল তার মধ্যে একটি গ্রেনেড ফোটেনি, সেটিও সংরক্ষণ করা হয়নি। সিটি করপোরেশন থেকে পানির গাড়ি এনে ত্বরিত ঘটনাস্থল ধোয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় এবং গ্রামের এক লোককে ধরে এনে তাকে দোষী সাজিয়ে ‘জজ মিয়া’ নাটক মঞ্চায়ন করা হয়।
এর বিচারকাজ পরে তাঁর সরকার শুরু করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিচার চলছে। আশা করি, সেই বিচারের রায় বের হবে। তবে আইভি রহমানসহ যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের আর কোনো দিন ফিরে পাব না। আমি তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।’ এ সময় তিনি বলেন, ২১ আগস্টের ঘটনায় আহতদের চিকিৎসায় সম্ভাব্য সব কিছুই করেছেন এবং যত দিন বেঁচে থাকবেন করে যাবেন বলে তাঁদের আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, ‘এ দেশের ১৫ই আগস্টের খুনিদের মতো ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িতদেরও তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার পুরস্কৃত করে এবং তাদের বাহ্বা দেয়। আর তাদের দুঃখ ছিল আমি কেন মরলাম না, আর এটারই তারা বারবার খবর নেওয়ার চেষ্টা করে।’
পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ছয় বছর তাঁকে দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। দেশে ফিরে আসার পর হত্যার জন্য বারবার তাঁর ওপর আঘাত এসেছে উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘বাংলাদেশের যেখানে গিয়েছি সেখানেই এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন। আর আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী জীবন বাজি রেখে আমাকে রক্ষা করেছেন। আর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা থেকেও নিজেদের জীবন বাজি রেখে তাঁরা আমার জীবন রক্ষা করেছেন।’
পঁচাত্তরের পর থেকে বাংলাদেশে ১৯টি ক্যু সংঘটিত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তখন বাংলাদেশ একটা রক্তাক্ত জনপদ ছিল। এরপর জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদের অভয়ারণ্য ছিল এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই আমরা চেষ্টা করেছি এই জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ বন্ধের। তার পরও এখনো আমাদের বহু নেতাকর্মী হত্যা-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের ঘাপটি মেরে থাকা সন্ত্রাসীরা দলে ঢুকে যায় এবং দলে ঢুকেই সেখানে গোলমাল করে আমাদেরই নেতাকর্মীকে হত্যা করে আমাদের ওপরই দোষ চাপায়। সে কারণে আমার একটা অনুরোধ থাকবে—যারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারতে পারে, জাতির পিতাকে হত্যা করতে পারে, নারী ও শিশু হত্যা করতে পারে, যারা বিরোধী দলের সমাবেশে প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রেনেড হামলা চালাতে পারে তারা কখনো দেশের কোনো কল্যাণ করতে পারে না। দেশের কোনো মঙ্গল করতে পারে না।’
প্রধানমন্ত্রী এই অশুভ শক্তি সম্পর্কে দেশের জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘তারা শুধু রক্ত নিতেই জানে। কাজেই তাদের সম্পর্কে দেশবাসীকে সজাগ থাকতে হবে। আর আমাদের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বলব, এদের দলে যেন কেউ না টানে। কারণ এদের উত্থানই হচ্ছে হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতির মধ্য দিয়ে। এদের চরিত্র কখনো বদলাবে না।’
আল্লাহর অশেষ কৃপায় বেঁচে গিয়ে তৃতীয়বারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকতে পারায় দেশের মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন উল্লেখ করে দেশবাসী এবং আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমার একটাই চেষ্টা যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ যেন এ দেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে পারি।’
পরে প্রধানমন্ত্রী ২১ আগস্টে নিহতদের পরিবার-পরিজন এবং আহতদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
সূত্র : বাসস।