
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার দুই মন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতিশোধ নিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দুইজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন যা ন্যাটোর এই দুই মিত্র দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরো বৃদ্ধি করেছে।
‘যারা চিন্তা করে যে, তুরস্কের ওপর উপহাসজনক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পার পেয়ে যাবে তাদের আমাদের দেশ এবং আমাদের জাতি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।’
এরদোগান আঙ্কারাতে এক ভাষণে এসব কথা বলেন। খবর নিউইয়র্ক টাইমসের।
যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মযাজক এন্ড্রু ব্রানসনকে আটকের প্রতিবাদে হোয়াইট হাউজ তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিচার মন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরেই তুরস্ক প্রতিশোধ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এরদোগান বলেন, তিনি তার সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তার তুরস্কে থাকা সম্পদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাদেরকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিচার এবং অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী’ বলে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। এ রকম আদেশের বেশীর ভাগই প্রতীকী। তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের ওই দুই কর্মকর্তার আদৌ কোনো সম্পদ রয়েছে কিনা এতে তা পরিষ্কার করা হয়নি।
একুশ মাস পূর্বে সন্ত্রাসীদের সাথে আঁতাত করার দায়ে আটক হওয়া যাজক এন্ড্রু ব্রান্সনকে(৫০) মুক্তি দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বারবার আহ্বান জানায়। যিনি তুরস্কের ইজমির শহরে ইভানজেলিকাল রেজারেকসন চার্চ নামে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্ররিচালনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানায়, ব্রান্সন একজন নিরাপরাধ ব্যক্তি, এবং তাকে তুরস্কের সরকার আটক রেখেছে তুরস্কের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে চলমান বিভিন্ন মামলার ব্যাপারে দর কষাকষির টোপ হিসাবে।
ব্রান্সনের আটককে উদ্দেশ্যমূলক আখ্যা দিয়ে কয়েকজন সিনেটরের সাথে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও যাজক ব্রান্সনের ব্যাপারটি নিয়ে তাদের দেনদরবার চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বিষয়টিকে ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন এবং এবিষয়ে এরদোগানের সাথে টেলিফোনে আলোচনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়াতে কুর্দি সন্ত্রাসীদের সহায়তা, যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক তুর্কি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেতা ফেতুল্লাকে(যাকে এরদোগান ২০১৬ সালে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের দায়ে অভিযুক্ত করেন) তুরস্কে প্রেরণে অস্বীকার ইত্যাদি কারণে ব্রান্সনের বিষয়টি উভয় দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
যাজক ব্রান্সনসহ ২০জনের মত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন কর্মচারী তুরস্কের কারাগারে আটক থাকাকে তুরস্কের বৈরী কূটনীতি আখ্যা দিয়ে দেশটির প্রতি ওয়াশিংটন রাগান্বিত হয়েছে।
এই বৈরিতার আরেকটি দিক হচ্ছে রাশিয়া থেকে তুরস্কের মিসাইল ব্যবস্থা ক্রয় করা যা ন্যটোর মুখের উপর দিয়ে তুরস্কে উড়ে এসেছে।
এরদোগান যিনি জুন মাসে পুনঃনির্বাচনের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় এসছেন এবং নতুন ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন তিনি দেশটিতে জাতীয়তাবাদী এবং যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে তার জনপ্রিয়তা বজায় রেখেছেন। তিনি তুরস্কের অর্থনৈতিক দৈন্যদশার জন্য বিদেশী ষড়যন্ত্রকে দায়ী করেন কিন্তু কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সাথে তার তুরস্কের মিত্রতার অবসান চান।
এখন অবদি তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তুরস্কের সাথে ইউরোপের, ন্যাটোর এবং ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে যাচাই করে যাচ্ছেন।
গত মাসে তুরস্কের একটি আদালত যাজক ব্রানসনকে আটক রাখার আদেশ জারি করার পর ব্রানসনের ব্যাপারে দুই দেশের দর কষাকষির অবসান হচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে। এ ব্যপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবাদের পর ব্রানসনকে কারাগার থেকে গৃহ বন্ধি করে রাখা হয়েছে। ব্রানসন এর পূর্বে আদালতে শুনানির সময় মানসিক সমস্যায় ভুগছেন বলে জানান। তার পরবর্তী শুনানি রয়েছে অক্টোবরে।
বুধবার ট্রাম্প প্রশাসন তুরস্কের বিচার মন্ত্রী আবদুল হামিত গুল এবং অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী সুলাইমান সোইলুর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারী মাইক পম্পেও এ ব্যাপারে বলেন, তুরস্কের ক্রিয়াকলাপকে যুক্তরাষ্ট্র কতটা গুরুত্ব দেয় এই নিষেধাজ্ঞা তার প্রমাণ।
‘তুর্কিদেরকে এটা এই বার্তা দেয় যে, ঘড়ির কাঁটার সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং ব্রানসনকে ফেরত দেয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। আমি আশা করি তারা এটা কি জন্য হয়েছে তা দেখবে, এমন একটি প্রতিক্রিয়া যাকে আমরা খুবই গুরুত্ব দিচ্ছি।’-শুক্রবার পম্পেও সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
পম্পেও এ বিষয় নিয়ে সিঙ্গপুরে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলুর সাথে একটি বৈঠক করেছেন এর পূর্বেও তিনি তার সাথে তিন বারের মত এই বিষয়টি নিয়ে টিলিফোনে আলোচনা করেছেন।
আনাদুলু নিউজ এজেন্সি জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাভুসোগলু তাদের বৈঠকের পর জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অপকৌশল কাজে আসবে না।
‘শুরু থেকেই আমরা বলে এসেছি যে, নিষেধাজ্ঞা এবং হুমকী দিয়ে এই বিষয়ে কোনো সমাধান হবে না’’, জনাব কাভুসোগলু এমনটি জানিয়েছেন। ‘‘আজ আমরা এটা আবারো বলছি। আমার বিশ্বাস আমরা এই বিষয়টি পরিষ্কার করতে পেরেছি।’’
শনিবার তার ভাষনে এরদোগান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে ধরণের প্রদক্ষেপ নিচ্ছে তা দুই দেশের কৌশলগত মিত্রতার পক্ষে ক্ষতিকর।
‘আমার দুই মন্ত্রী যাদের যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সম্পদ নেই, তাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞাকে মেনে নেয়া একেবারেই অসম্ভব।’-জনাব এরদোগান বলেন।
এরদোগান অভিযোগ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যাজক ব্রানসনের পক্ষে সাফাই গাইছে যাকে তিনি ফেতুল্লাহ এবং কুর্দিস্তান ওয়ার্কাস পার্টির সাথে যোগাযোগের দায়ে অভিযুক্ত করেন এবং এই দুইটি সংগঠন তুরুস্কে সন্ত্রাসী সংঘঠন বলে বিবেচিত। তবে ব্রানসন সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন।
ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাকে বানচাল করার ষড়যন্ত্র করার কারণে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় হালক ব্যাংকের কর্মকর্তা মেহমেত হাকাম আতালিয়াকে অভিযুক্ত করার কারণে এরদোগন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ সম্প্রতি জানিয়েছিলেন যে, তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ব্রানসনকে যুক্তরাষ্ট্রে এবং আতালিয়াকে তুরস্ক ফিরিয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছিলেন কিন্তু শেষ মুহূর্তে তুরস্ক তার মনোভাব পাল্টায়।
কিন্তু এরদোগান যুক্তারাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন করে দেন এবং ঘোষণা করেন ‘এটি একটি খ্রিস্টান উগ্রপন্থি এবং জায়নিস্টদের উদ্ভাসিত উদ্যোগ।’ যা তার গৌড়া এবং জাতীয়তাবাদী অনুসারীদের নিকট খুবই প্রিয়।