
ঈদযাত্রার বাস-ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রি শেষ। সারা দেশের সহাসড়কে মহাভোগান্তির দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘরমুখো মানুষের বাড়ী ফেরা শুরু হচ্ছে।
অব্যাহত বৃষ্টি, মহাসড়কের খানাখন্দ, চলমান রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার কাজ, অনিয়ন্ত্রিত গতি আর লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ী চলাচলে সড়কে ভোগান্তি প্রধান কারণ চিহ্নিত হলেও কার্যত: এগুলো কোন প্রতিকার হয়নি। তাই প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরেও ঈদযাত্রায় মহা ভোগান্তির দুশ্চিন্তা মাথায় থাকছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অবস্থা
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম চার লেন, কোথাও আটলেন, বেশ কয়েকটি উড়ালসেতু এবং উড়াল সেতুতে লেন বৃদ্ধি করেও ভোগান্তি কমেনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যাত্রীদের। নিয়মিত ৬ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিচ্ছে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টায়। ঈদের সময় এই সড়কের গাড়ীর গতি উদ্বেগ বেশি। এই মহাসড়ক দিয়ে দক্ষিণবঙ্গের কুমিল্লা, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনীসহ বেশ কয়েকটি জেলার মানুষ চলাচল করেন। আর বাণিজ্যিক ও পর্যটনের নগরীতে যাওয়ার জন্য এই সড়কেই যেতে হয়।
কুমিল্লা থেকে ঢাকার শনির আখড়া পর্যন্ত রাস্তার অনেক অংশ খানাখন্দে ভরপুর। ফলে এই রাস্তায় চলাচল করা ট্রাক-বাসসহ অন্যান্য যানবাহনকে খুব ধীর গতিতে চলতে হয়। একটু এদিক-সেদিক হলেই রাস্তায় গর্তে আটকে যায় মালভর্তি ট্রাক কিংবা যাত্রীবাহী বাস। এতে করে আটকে যায় পেছনের সব গাড়ী।
আসন্ন ঈদের সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ির চাপ বেড়ে যাবে প্রায় তিন গুণ। বোরহানের কথায় বোঝা যায়, ঈদের চাপের মধ্যে পড়ে এই সড়কে চলমান হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক বেহাল
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে উত্তরবঙ্গের রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ২৩ জেলার মানুষ চলাচল করেন। এই সড়কের চার লেনের কাজ শুরুর পর থেকে ঢাকার চন্দ্রা মোড় থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার পথে প্রায়ই আট থেকে ১০ ঘণ্টার যানজটে পড়েন সাধারণ মানুষ।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ও গাজীপুর বাইপাস হয়ে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহনগুলো চন্দ্রা মোড় হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুর দিকে চলে যায়। দুই দিকের যানবাহনের প্রবেশমুখ হওয়ার কারণে প্রায়ই ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয় এই চন্দ্রা মোড়ে।
চন্দ্রা মোড় থেকে টাঙ্গাইল, এলেঙ্গা পর্যন্ত চলছে চার লেনের কাজ। এরপর সেতু পার হলেই সিরাজগঞ্জ, হাটিকুমরুল, শেরপুর, মোকামতলা, গাইবান্ধার কিছু অংশসহ রংপুর পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ছোট-বড় শত শত খানাকন্দ ও গর্ত। এসব কারণে ঢাকা থেকে রংপুর যেতে সময় লাগে প্রায় ১৬-১৮ ঘণ্টা । তবে স্বাভাবিকভাবে এই সড়কে ঢাকা থেকে রংপুর যেতে সময় লাগত ৮-১০ ঘণ্টা।
বাড়তি চাপে নাজুক ঢাকা-আরিচা
পশ্চিমাঞ্চলের ২২টি জেলার মানুষ রাজধানী ঢাকা থেকে এই সড়ক ব্যবহার করেন গ্রামের বাড়ি পৌঁছতে। ছাড়া উত্তরবঙ্গের প্রবেশদার যমুনা সেতুর রোডে বাড়তি চাপ পড়ায় উত্তরের অনেকেই ব্যাবহার করেন আরিচা-নগরবাড়ী নৌপথ। ফলে বাড়তি চাপ থেকে ডাকা আরিচা মহাসড়কে। ফলে এবারে ঈদের আগেই বাড়তি যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ঈদের আগাম টিকেটের গাড়ী চলাচল শুরু করলে এই সড়কে মহাযানজটের সৃষ্টি হবে।
ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-টাঙ্গাইলের সড়কের যানজটের সৃষ্টি হয় মূলত ঢাকার সাভারের আমিনবাজার, হেমায়েতপুর, নবীনগর এলাকা থেকেই। তবে মানিকগঞ্জ এলাকায় ফেরিঘাট পারাপারের সময় লাইনে দাঁড়ানো যানবাহনের কারণে বেশির ভাগ যানজটের সৃষ্টি হয়। মূলত চন্দ্রার মোড়ের যানবাহনের চাপে যে যানজট তৈরি হয়, সেটারই প্রভাব পড়ে এই সড়কের ওপরে।
ঢাকা-খুলনা ভোগান্তি ৬ লেনে
ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের বাবুবাজার থেকে শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ঘাট হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৬ কিলোমিটার মহাসড়ক দুই লেন থেকে ছয় লেনে উন্নীতের কাজ চলছে। এ জন্য বিপুলসংখ্যক গাড়ি মহাসড়কেই মালামাল লোড-আনলোড করছে। সেতু ও কালভার্টগুলো ভেঙ্গে নতুন করা হচ্ছে।
রাস্তার উন্নয়ন কাজে আটকে থাকে নিয়মিত চলাচল করা গাড়ী। এছাড়া নির্মাণ সামগ্রী গোটা মহাসড়ক জুড়েই গাড়ীর গতি আটকে রেখেছে। ঈদে বাড়তি গাড়ীর চাপে এই সড়ক ভীন্ন ধরনের চাপ তৈরি হবে।
খানাখন্দে মলিন ঢাকা-বরিশাল ঈদযাত্রা
রাস্তা মাঝে গর্ত আর খানাখন্দের কারণে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে সারা বছরই দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এই বৃষ্টির মাঝেই মহাসড়কের টেকেরহাট থেকে মোস্তফাপুর পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার এলাকায় চলছে সংস্কার কাজ। ঈদের বাড়তি গাড়ী ও মহাসড়কে নির্মাণ সামগ্রী ঈদযাত্রায় ভোগান্তি তৈরি করবে।
সারা বছর যানজট ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চার লেনে উন্নতি করার কাজ শুরুর আগেই থেকে যানজট লেগে আছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে। নির্দিষ্ট সময়ে দেড়গুন সময়ে বাড়ী ফিরতে হয় বেশিরভাগ সময়েই। তবে ঈদসহ যে কোন উৎসবে এই ভোগান্তি আরো বাড়ে।
এই সড়কের যানজট শুরু হয় গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায়। ঢাকা থেকে উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর হয়ে চৌরাস্তায় যাওয়ার পথেই মহাদুর্ভোগে পড়তে হয়। সড়কের মধ্যে খানাখন্দ ও গর্ত ছাড়াও রয়েছে ফুটপাত দখল। এই সড়কে ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে নানা রকমের দোকানপাট। ফলে মূল রাস্তাটি ছোট হয়ে পড়ায় প্রায়ই ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। যদিও ২০১৬ সালে জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে।
তবে এই অংশের কারণে ওই চার লেনের সুবিধার থেকে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে মানুষের। এই সড়ক দিয়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার যানবাহনসহ টাঙ্গাইল, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুর জেলার যানবাহনও চলাচল করে। তবে এবার ঈদে বাড়তি গাড়ির চাপের কারণে সৃষ্ট যানজট পেরিয়ে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত পৌঁছানো নিয়েই বেশি শঙ্কিত মানুষ।
সারা দেশের সড়ক ও সেতুর ১৫৮টি ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্ট চিহ্নিত
ঈদে সড়কে মানুষের ভোগান্তি কমাতে সম্প্রতি ঢাকাসহ সারা দেশের সড়ক ও সেতুর ১৫৮টি ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। যে পয়েন্টগুলো স্বচ্ছন্দ ঈদযাত্রা ব্যাহত করতে পারে। সে কারণে কয়েক দিন আগে সড়ক ও সেতুর ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্টগুলো মেরামত করতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়কে চিঠিও পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ সদর দফতরের সূত্র জানা গেছে।
চিহ্নিত ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্টগুলো মধ্যে রাজধানীতে ১৬টি, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর মহাসড়কে ৩৩টি, ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে ৩৩টি, ঢাকা-মাদারীপুর মহাসড়কে ৫৩টি এবং ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ২৩টি।
সওজের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এইচডিএম) এক জরিপেও দেশের সড়কগুলোর বেহাল দশার চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি তারা এ নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহাসড়কগুলোর অবস্থা আগের থেকে এখন উন্নত হলেও প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি সড়ক যান চলাচলের অনুপযোগী। সারা দেশে মোট সড়কের ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশের বর্তমান অবস্থা বেহাল । আর মহাসড়কের ৫৭ ভাগ ভালো হলেও সারা দেশে দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি সড়ক খুবই খারাপ অবস্থায় রয়েছে।
জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক, জেলা সড়কসহ সওজের অধীন সারা দেশে প্রায় ২১ হাজার কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক রয়েছে। এই ২১ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সারা দেশের ১৭ হাজার ৯৭৬ কিলোমিটার সড়ক জরিপ করেছে এইচডিএম। সেই জরিপের ভিত্তিতেই ২০১৭-১৮ সালের এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
এক সড়কের যানবাহন ভোগান্তির কারণ
সারা দেশের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে যানজটের অন্যতম একটি কারণ হলো, এক সড়কেই সব ধরনের যানবাহন চলাচল করে। বাইসাইকেল থেকে শুরু করে বাস, প্রাইভেট, লেগুনা, ট্রাক ও তিন চাকার যানবাহন—সবই একই সড়কে চলাচল করে। কিন্তু এসব যানবাহনের চালকরা কেউই ঠিকমতো নিয়ম মানতে চান না। নিজের ইচ্ছামতো সড়কের বিভিন্ন প্রান্ত ঘেঁষে চলাচল করেন। ফলে দীর্ঘ সড়কের চলমান অন্য যানবাহনগুলো বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। ঈদের সময় বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে এই দৃশ্য বেশি পরিমাণে দেখা যায়। তাই ভোগান্তির অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে এটি।
আবহাওয়ার কারণে বাড়তে পারে সড়কের ভোগান্তি
চলতি বছরের ঈদুল ফিতর এবার পালিত হচ্ছে ভরা বর্ষার মৌসুমে। বাংলাদেশের প্রকৃতির ধারা অনুযায়ী বছরের জুন-জুলাই মাসে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটে। সম্প্রতি বৃষ্টির কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের সড়কে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ বৃষ্টি হওয়ার ফলে সড়কের অনেক স্থানে পানি জমে যায়। ভাঙা ও খানাখন্দ-গর্তে যানবাহনের চাকা পড়ে গিয়ে নানা রকমের দুর্ঘটনার সৃষ্টি হয়। ফলে ওই সড়কগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রাপথে যদি প্রবল বৃষ্টি সঙ্গী হয়, তবে তাদের পড়তে হতে পারে ভয়াবহ যানজটের কবলে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ঈদের আগমুহূর্তে অর্থাৎ ১০ থেকে ১৬ জুন—এই সময়ে নিয়মিত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।সূত্র-আরটিএনএন