
ভারত ও চীন সীমান্তের মধ্যে ডোকালাম সমস্যা সাময়িকভাবে কেটে গেলেও সীমান্তে পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুভাষ ভামরে।
তিনি বলেন, সীমান্তে টহলদারি, সীমান্ত অতিক্রম এবং বিভিন্ন অচলাবস্থার কারণে সমস্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেকোনো সময় উত্তেজনার পারদ চড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার জাতি গঠনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা শীর্ষক এক সেমিনারে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
ভারতের প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুভাষ ভামরে বলেন, সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ভামরে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রাষ্ট্রবহির্ভূত শক্তিগুলোর হাতে চলে আসতে পারে। এমনকি ভারতের মতো দেশে জঙ্গি ভাবধারা পাকিস্তানের অনুঘটক হয়ও উঠতে পারে।
এ সময় ভামরে পাকিস্তানকে উদ্দেশ করে বলেন, প্রতিবেশী দেশের দিক থেকে ভারত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণরেখায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে সেনা ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর আক্রমণের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। কাশ্মীরের পরিস্থিতি এখনো একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
ভারত ও চীন সীমান্ত চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ নিয়ন্ত্রণরেখা রয়েছে। গত ১৬ জুন ডোকালামে চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘ অচলাবস্থার সূচনা হয়। এ এলাকায় চীনের সেনাবাহিনীর রাস্তা নির্মাণের কাজ ভারতীয় সেনাবাহিনী বন্ধ করে দিলে অচলাবস্থার সূচনা হয়। দীর্ঘ ৭৩ দিন চীন সেনাবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে ভারতীয় সেনারা। অবশেষে গত ২৮ আগস্ট অচলাবস্থার অবসান ঘটে।
ভারতের অভিযোগ, উত্তর ডোকালামে চীন সেনা মোতায়েন করে রেখেছে এবং এই এলাকায় পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে।
গত জানুয়ারি ভারতের সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াত বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্তের থেকে এবার ভারতের চীনের সঙ্গে সীমান্তের দিকে নজর ঘোরানোর সময় চলে এসেছে। চীনের সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতি যে যথেষ্ট উদ্বেগজনক, সে সময়েই তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সেনাপ্রধান।
ডোকলাম সঙ্কট, ভারত-চীন সীমান্ত বাহিনীর বার্ষিক বৈঠক বাতিল
ভুটানের কাছে ডোকলাম ভূখণ্ড নিয়ে দিল্লি ও বেইজিং সমঝোতার পথে হাঁটছে বলে মনে হলেও ভারতীয় সেনাবাহিনী ও পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)’র মধ্যে উত্তেজনা কমেনি। ওই অঞ্চল থেকে সেনা সরিয়ে নেয়ার পর প্রায় মাস পার হয়েছে।
এমনই পরিস্থিতিতে প্রথা ভেঙে সীমান্তে বার্ষিক ‘বর্ডার পার্সোনাল মিটিং’ বা বিপিএম বৈঠক থেকে বিরত থাকল দু’দেশের সেনাবাহিনী। অন্যদিকে, চলতি মাসের শেষের দিকে চীন ও ভারতের মধ্যে সপ্তম ‘হ্যান্ড ইন হ্যান্ড’ মহড়া হওয়ার কথা থাকলেও তাতেও কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
প্রতিবছর চীনের জাতীয় দিবস উপলক্ষে ভারতীয় ও চীনা সেনাবাহিনীর মধ্যে বিপিএম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৪ হাজার কি.মি. দীর্ঘ ভারত-চীন সীমান্তের পাঁচটি জায়গায় মিলিত হন দুই সেনা প্রতিনিধিরা। এ বছর ১ অক্টোবর ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে প্রথা ভেঙে এবার বাতিল করা হয় ওই বৈঠক।
ভারতীয় সেনা সূত্র টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানায়, এবছর দৌলতবেগ, চুশুল, বুমলা, কিবিথু ও নাথুলায় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তবে এবার ভারতীয় পক্ষকে পিএলএ আমন্ত্রণ জানায়নি। ফলে বাতিল হয়ে যায় বৈঠক।
উল্লেখ্য, ডোকলামে সড়ক নির্মাণের কাজ বন্ধ করেছে চীন। তবে সেখানে এখনো মোতায়েন রয়েছে চীনা সেনা। একই ভাবে সীমান্তের এপারে টহল দিচ্ছে ভারতীয় বাহিনী। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, বিপিএম বৈঠক হলে দু’পক্ষের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারত।
ডোকলামের ৭৩ দিন মুখোমুখি অবস্থানের পর এখনো সিকিম-ভুটান-তিব্বত ত্রি-জংশনের কাছাকাছি অঞ্চলে দুই বাহিনীই ধাপে ধাপে শক্তি বজায় রাখছে।
একটি সূত্র জানায়, ‘পিএলএ ঘটনাস্থল থেকে জামফেরী ঢালের দিকে গাড়ি চলাচল উপযোগী রাস্তার নির্মাণ বন্ধ করলেও ওই অঞ্চলে তাদের শক্তি বজায় রেখেছে।’
মুখোমুখি অবস্থানের সময় দু’পক্ষ অতিরিক্ত পদাতিক ব্যাটালিয়নের পাশাপাশি সাঁজোয়া যান(ট্যাংক), আর্টিলারি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। আগে এখানে সেনা সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় অনেক কম ছিল।
বলা হচ্ছে, আগামী ১৮ অক্টোবর চীনের কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেস হওয়া পর্যন্ত ডোকলাম পরিস্থিতি একই থাকবে। এই কংগ্রেসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দ্বিতীয়বারের মত আরো পাঁচ বছরের মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, কংগ্রেস শেষ হওয়ার পর পিএলএ’র আচরণ কী হয় তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
প্রতিবছর চীন-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন ‘বর্ডার পার্সোনাল মিটিং পয়েন্ট’ এ সাত থেকে আটটি অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। যার মধ্যে আছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উপহার বিনিময়, বক্তৃতা ইত্যাদি থাকে। গত জুনের মাঝামাঝি ডোকলাম সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে ভারতীয় সেনারা চীন সীমান্ত অতিক্রম করেনি। এমনকি গত আগস্টে পিএলএ’র ৯০তম বার্ষিকী উদযাপনকালেও নয়।
এছাড়াও, ভারত ও চীনের মধ্যে ‘হ্যান্ড ইন হ্যান্ড’ সামরিক মহড়াও বাতিল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারত বিষয়টি নিয়ে চীনের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করলেও এখন পর্যন্ত চীন কোনো জবাব দেয়নি।