
ভারতের জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যে তিন স্বাধীনতাকামীকে হত্যা করেছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানায়, সোমবার ভোরে দক্ষিণ কাশ্মিরের অনন্তনাগ জেলায় এ ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, এই হত্যাকাণ্ডের জেরে অনন্তনাগে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় পূর্ব সতর্কতা হিসেবে ওই এলাকার স্কুল-কলেজগুলো বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ।
এক বিবৃতিতে পুলিশ জানায়, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উপস্থিতির খবর পেয়ে অনন্তনাগের হাকোরা এলাকায় অভিযান শুরু করে পুলিশ। এসময় লুকিয়ে থাকা জঙ্গিরা পুলিশের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হলে ওই তিন জঙ্গি নিহত হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে একে ৪৭ রাইফেল, পিস্তল ও হাতবোমা উদ্ধার করা হয়েছে।
ভারতে মূর্তি ভেঙে হিন্দুত্ব আর বামপন্থার লড়াই
দিল্লি: বুধবার সকালে হিন্দুত্ববাদীদের অন্যতম প্রধান আদর্শিক নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর একটি মূর্তি হাতুড়ি দিয়ে কিছুটা ভেঙ্গে তার ওপরে কালো কালি লাগিয়ে দিয়েছে কলকাতার কয়েকজন অতি-বামপন্থী ছাত্রছাত্রী। পুলিশ সেখান থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
এর আগে ত্রিপুরার নির্বাচনে বিজেপি বড়সড় সাফল্য পাওয়ার পরের গত কয়েকদিনে সে রাজ্যের অন্তত দুটি জায়গায় ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে লেনিনের মূর্তি। অভিযোগের তীর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি-র কর্মী সমর্থকদের দিকে। খবর-বিবিসি
যদিও দলীয় কর্মীদের সরাসরি ওই মূর্তি ভাঙ্গার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে বিজেপি, তবে তারা লেনিনের মূর্তি নিয়ে বামপন্থীদের কটাক্ষও করেছে একই সঙ্গে।
বুধবার শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি ভাঙ্গার সময়ে ছাত্রছাত্রীদের হাতে ছিল লেনিন মূর্তি ভাঙ্গারই প্রতিবাদ সম্বলিত পোস্টার।
মতাদর্শগত নেতাদের মূর্তি ভেঙ্গে দেওয়ার পেছনে কী তাহলে বামপন্থী আর হিন্দুত্ববাদী – এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক আদর্শের লড়াই-ই কাজ করেছে?
এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দের জবাব ছিল, ‘এতদিন বৌদ্ধিক পর্যায়ে সংঘাতটা ছিল বামপন্থী আর জাতীয়তাবাদী, অর্থাৎ আপনি যাদের হিন্দুত্ববাদী বলছেন, তাদের মধ্যে। বামপন্থী বুদ্ধিজীবিরাই ইতিহাস ব্যাখ্যা করে এসেছে এতদিন। কিন্তু জাতীয়তাবাদীরা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তাদের মতাদর্শের সমর্থক বুদ্ধিজীবিরা ইতিহাস সমাজ নতুন করে ব্যাখ্যা করছেন এখন।’
তিনি বলেন, ‘তাই এই সংঘাতটা ইন্টেলেকচুয়াল পর্যায়ে আছেই। তবে নতুন যেটা যোগ হয়েছে, তা হল ওই দুই মতাদর্শের লড়াই এখন তৃণমূল স্তরেও প্রকট হচ্ছে। এটা সম্ভবত তারই বহি:প্রকাশ।’
শুধু যে লেনিন বা শ্যামাপ্রসাদের মূর্তিই ভাঙ্গা হয়েছে, তা নয়।
বিজেপি তো কংগ্রেস কে হারিয়ে অনেক রাজ্যেই ভোটে জিতেছে। কিন্তু তারপরে সেখানে জওহরলাল নেহরু বা ইন্দিরা গান্ধীদের মূর্তি ভাঙ্গার তো সংবাদ পাওয়া যায় নি!
তাহলে কেন কোথাও লেনিন বা কোথাও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মতো যারা এই দুই মতাদর্শের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা – তাদের মূর্তি ভাঙ্গা হচ্ছে?
এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে থেকেই কংগ্রেস ছিল মুক্তমনাদের একটা মঞ্চ। সেখানে বামপন্থীরাও যেমন থেকেছেন, তেমনই দক্ষিণপন্থীরাও ছিলেন। তাই সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে কংগ্রেসই বিজেপি-র প্রধান প্রতিপক্ষ হলেও তাদের সঙ্গে সেভাবে মতাদর্শের লড়াই নেই হিন্দুত্ববাদীদের।’
তিনি বলেন, ‘কিন্তু বামপন্থীদের সঙ্গে তাদের চরম মতাদর্শগত বৈরিতা। তাই কেরালায় যেটা অনেকদিন ধরেই আমরা দেখছি – দুই মতাদর্শের লড়াই – এবার সেটা কিছু কিছু দেখা যাচ্ছে ত্রিপুরার মতো জায়গাতেও।’
এই বিপরীত মেরুর আদর্শের মধ্যে চরম সংঘাত এতদিন মূলত দেখা গেছে দক্ষিণ ভারতের কেরালাতেই। সেখানেই দুই পক্ষের সংঘাত বারে বারেই রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। এভাবে মতাদর্শগত নেতাদের মূর্তি ভাঙ্গার আসলে দুই পক্ষের মধ্যেই পরমত অসহিষ্ণুতার একটা লক্ষণ – বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক শুভাশীষ মৈত্র।
তার কথায়, ‘এটা যে দুই মতাদর্শগত বিরোধের প্রকাশ, তা ঠিক। কিন্তু আমার মনে হয় এর মধ্যে পরমত অসহিষ্ণুতা বেশি প্রকাশ পাচ্ছে – যেখানে অন্য মতের আদর্শিক নেতাদের সামনে রাখবই না – এরকম একটা চিন্তা প্রকাশ পাচ্ছে। এটাই সবথেকে ভয়ের।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে বলছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও তো সেখানে লেনিন মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল। মনে রাখতে হবে, সেখানে লেনিনকে দেখা হত রাষ্ট্রশক্তির প্রতীক হিসাবে। ত্রিপুরায় লেনিন তো রাষ্ট্রশক্তির প্রতীক ছিলেন না, সেখানে তিনি মতাদর্শের প্রতীক ছিলেন।’
বিশ্লেষকরা অবশ্য এটাও মনে করছেন, যে কেরালা ছাড়া অন্য যে দুটি জায়গায় বামপন্থীরা শক্তিশালী ছিল – সেই পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরাতে তারা এখন চাপের মধ্যে আছে। তাই মূর্তি ভাঙ্গা বা তাকে কেন্দ্র করে মতাদর্শগত সংঘাতের অসহিষ্ণুতার বহিপ্রকাশ কেরালার বাইরে কতটা ছড়িয়ে পড়বে, তা বলা কঠিন।
কিন্তু সর্বভারতীয় স্তরে বৌদ্ধিক পর্যায়ে দুই মতাদর্শের মধ্যে সেই সংঘাত চলতে থাকবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।