
রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাতি নিধন অভিযান চালানোর কারণে মায়ানমারের সেনাবাহিনীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স-এর এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এ আহ্বান জানান জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি।
একই সঙ্গে নিজের দেশে এই ভয়াবহতা সংঘটিত হয়েছে এটা স্বীকার করে নিতে মায়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচির ওপর চাপ সৃষ্টি করতেও আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, রাখাইনে জাতি নিধনের অভিযোগ বেমালুম প্রত্যাখ্যান করে যাচ্ছে মায়ানমার সরকারের ভিতরকার শক্তিশালী শক্তি। কি মাত্রায় নৃশংসতা হয়েছে তা প্রত্যক্ষ করতে পারে এমন কাউকে বা কোনো সংগঠন, এমনকি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে তারা রাখাইনে প্রবেশের সুবিধা দিচ্ছে না।
রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে যাও, মায়ানমারে মাইকিং
রোহিঙ্গা মুসলিমকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে মায়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে বলা হচ্ছে, ‘তোমরা (রোহিঙ্গা) আমাদের সঙ্গে কথা বলবে না। তোমরা আমাদের কেউ না। আমাদের ভূখণ্ড ছেড়ে বাংলাদেশে চলে যাও।’
রবিবার সকালে জিরো লাইন থেকে রোহিঙ্গাদের সরে যেতে মায়ানমারের সেনাবাহিনী কাটাতারের বেড়ার কাছে এসে মাইকিং করে। গত কয়েক দিন থেকেই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্র সীমান্তের জিরো লাইনে এ নির্দেশনা দিয়ে তারা মাইকিং করছে। বান্দরবান সীমান্তের জিরো লাইনে থাকা ৬ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা রয়েছে।
মায়ানমার থেকে সর্বশেষ পর্যায়ে যেসব রোহিঙ্গা নারীপুরুষ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারীদের ভাষ্যমতে, মাইকিং করে বলা হচ্ছে, ‘মায়ানমার তোমাদের দেশ নয়। তোমরা বাঙালি। তোমাদের দেশ বাংলাদেশ। ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তোমরা মায়ানমার ছেড়ে চলে যাও। না গেলে তোমাদের গুলি করে হত্যা করা হবে।’
এ ঘটনার পর রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জিরো লাইন স্পর্শকাতর হওয়ায় এসব রোহিঙ্গাদের কোথাও সরিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। গত বছরের ২৫ আগস্ট মায়ানমারের রাখাইনে দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেন।
এদের মধ্যে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২০ হাজার বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান নেন, যার ৬ হাজারই তুমব্র সীমান্তের জিরো লাইনে। ইতোমধ্যে ইউএনএইচসিআর’র সহায়তায় জানুয়ারিতে উপজেলার সাপমারা ঝিড়ি, বড় ছনখোলা, দোছড়ি ও ঘুনধুম সীমান্তের বাহির মাঠ এলাকায় অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে সরিয়ে নেয়। তবে জিরো লাইনের ৬ হাজার রোহিঙ্গাকে কোথাও সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি।
উখিয়ার বালুখালী মাদ্রাসার সামনে দেখা হয় মায়ানমারের রাচিদংয়ের ধইনচ্যাপাড়ার বাসিন্দা সাইফুল্লাহর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মাইকিং করে চলে যেতে বলছে। আবার অতর্কিত এসেও ঘরে আগুন দিচ্ছে। গুলি করছে। বার্মার মগরা যা ইচ্ছা তা-ই করছে।’
উখিয়ার কুতপালং এলাকায় টেলিভিশন উপকেন্দ্রের সামনে দেখা হয় মায়ানমারের মংডু জেলার থামি থেকে আসা দিলারার তিনি বলেন, ‘আমাদের পাড়ায় প্রায় ৫০০ পরিবার ছিল। গত এক সপ্তাহে ২১ জনকে কেটে হত্যা করা হয়েছে। এরপর গতকাল (শুক্রবার) থেকে আবার মাইকিং করে আমাদের ১২ তারিখের মধ্যে চলে যেতে বলছে। তাই আর সেখানে থাকার সাহস পাইনি। দুইদিনেই আমাদের পুরো পাড়া সাফ হয়ে গেছে। সবাই বাংলাদেশে চলে এসেছে।’
তিনি আরো বলেন, মঙ্গলবার মধ্যে রোহিঙ্গাদের মায়ানমার ছাড়ার আহ্বান জানিয়ে দেশটির সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে মায়ানমার ছেড়ে না গেলে গুলি করে মেরে ফেলা হবে বলে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
জিরো লাইনের রোহিঙ্গা আরিফ ও দিল মোহাম্মদ জানান, এতদিন তারা ভালই ছিলেন। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে মায়ানমারের সেনাবাহিনী ও বিজিপি প্রায়ই ফাঁকা গুলিবর্ষণ করছে। তুমব্র সীমান্তের ওপারে ঢেকুবুনিয়া এলাকায় নতুন করে বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে।
এই রোহিঙ্গারা আরো জানান, কাটাতারের বেড়া ঘেষে তাবু টাঙ্গিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়েছে। তারা মাইকিং করছে। ফলে সবার মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মায়ানমারের রাচিদং থানার শিলখালী এলাকা থেকে আসা মোক্তার আহমদ (৩০) জানান, ১৫ দিন আগে হঠাৎ করে পাড়ায় ঢুকে মায়ানমারের সেনাবাহিনী এলোপাতাড়ি গুলি করতে শুরু করে। মোক্তার গুলিবিদ্ধ হয়ে পালিয়ে আসে বাংলাদেশে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমার পরিবারে আরও ১১ জন ছিল। গত (শুক্রবার) রাতে তারা সবাই চলে এসেছে। সেখানে নাকি মাইকিং করে চলে যেতে বলেছে। সেজন্য সবাই এসে গেছে।’
রোহিঙ্গা মাঝি (তত্ত্বাবধানকারী) নুরুল আমিন বলেন, ‘মায়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা বলছেন- তোমরা আমাদের ভূ-খণ্ড ছেড়ে বাংলাদেশে চলে যাও। না হলে তোমাদের এখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে।’
ঘুনধুম ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গির আজিজ জানান, সীমান্ত সংক্রান্ত জটিলতার কারণে জিরো লাইনের রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেয়া আপাতত সম্ভব হচ্ছে না।
নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরওয়ার কামাল জানান, এসব রোহিঙ্গারা মায়ানমারের ভূখণ্ডেই অবস্থান করছে। এজন্য তাদের আমরা সরিয়ে নিতে পারছি না।
কক্সবাজার বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবদুল খালেক জানান, জিরো লাইনে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে মায়ানমার কর্তৃপক্ষের চাপ দেয়ার বিষয়টি আমরা জেনেছি। আমরা সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করছি।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক জানান, যেহেত এসব রোহিঙ্গারা মায়ানমারের ভূখণ্ডে রয়েছে। এজন্য নিজ দেশে তাদের নিতে কোনো চুক্তির প্রয়োজন নেই। এরপরও আমরা তাদের বিষয়টি জানিয়েছে।