
যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাখাইন সহিংসতার শিকার ৬ লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। এতে জামায়াত নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
অভিযোগ তোলা হয়েছে মানবাধিকার কর্মীদের ওপর দমনক্রিয়া চালানোর। স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের আদিবাসী এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সুরক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থানের সমালোচনা করা হয়েছে এতে। তবে এক দশকের স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে দারিদ্র্য দূর করার প্রশংসা করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ১৫৯ দেশের ওপর তৈরি করা সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা- অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে উদ্বেগজনকভাবে বাংলাদেশে বিচার বিভাগে সরকারের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাইয়ে প্রধান বিচারপতির সভাপতিত্বে সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করা হয়।
সেই সংশোধনীতে বিচারকদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও অযোগ্যতার অভিযোগ আনা হলে পার্লামেন্টকে অভিশংসনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি ওই সংশোধনী বাতিল করে দেয়ার পর তার সমালোচনা হয় সরকারের পক্ষ থেকে এরই পরিপ্রেক্ষিতে নভেম্বরে প্রধান বিচারপতির পদ ত্যাগ করেন এসকে সিনহা। এর ফলে দেশ এমন একটি পরিস্থিতিতে ধাবিত হয়, যাতে ইঙ্গিত মেলে নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ করেছে।
বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা- অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে সাংবাদিকরা অব্যাহতভাবে হামলার মুখে। সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুলকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া বেশকিছু সাংবাদিক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের টার্গেট ও হয়রানি করতে নিপীড়ণমূলক আইনের ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে সরকার।
বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদনে মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সীমিত করা হয়েছে। অব্যাহত রয়েছে জোরপূর্বক গুম।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা রোধ: অ্যামনেস্টি’র প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা রোধ করতে নিষ্পেষণমূলক আইনের ব্যবহার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আহ্বান উপেক্ষা করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (আইসিটি) শাস্তিমূলক ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। নতুন করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রবর্তন করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে, অনলাইনে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আরো সীমাবদ্ধ করে দেয়া হবে।
২০১৫ ও ২০১৬ সালে সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন- আনসার আল-ইসলাম ধর্মনিরপেক্ষ কর্মীদের হত্যা করেছে। দলটির বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে। দলটিকে গত বছরের মার্চ মাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অপরাধীদের বিচারকার্যে দেরি হওয়ায় বেসামরিক সমাজে এখনো তাদের প্রভাব বিদ্যমান।
সমাবেশ করার অধিকার সীমাবদ্ধ: শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার স্বাধীনতার অধিকার তীব্রভাবে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রচারণা বিষয়ক বৈঠক ও রাজনৈতিক সমাবেশ করার অনুমতি দেয়া হয়নি। ফরেইন ডোনেশন রেগুলেশন অ্যাক্টের অধীনে বিভিন্ন এনজিও’র কর্মীদের কার্যক্রম সীমিত করে দেয়া হয়েছে।
জোরপূর্বক গুম: নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে নিয়মিতভাবে জোরপূর্বক গুম হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এক্ষেত্রে, প্রধানত বিরোধীদলীয় সমর্থকদের টার্গেট করা হয়েছে। গুম হওয়া অনেককে পরবর্তীতে মৃত হিসেবে পাওয়া গেছে। ফেব্রুয়ারিতে কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জাতিসংঘের জোরপূর্বক বা অনিচ্ছাকৃত অন্তর্ধান বিষয়ক সংস্থা বলেছে, সামপ্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর ৮০ জনের অধিক ব্যক্তি গুম হয়েছেন। মার্চ মাসে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র এক সাবেক নেতার ছেলে হাম্মাম কাদের চৌধুরীকে ছয়মাস বাইরের জগৎ থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বন্দি রাখার পর মুক্তি দেয়া হয়। তার বাবাকে আগেই ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। এরকম আরো দুই নেতার সন্তান আহমেদ বিন কাসেম ও আব্দুল্লাহিল আমান আজমি’কে নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে নিখোঁজ হন।
বিচার বিভাগে হস্তপেক্ষ: বিচার বিভাগে সরকারের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ নিয়েও প্রতিবেদনটিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গত জুলাইয়ে প্রধান বিচারপতি একটি বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনীর (ষোড়শ সংশোধনী) বাতিল করে দেন। সেই সংশোধনী অনুসারে, বিচারকদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও অযোগ্যতার অভিযোগ আনা হলে পার্লামেন্টকে অভিশংসনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। সংশোধনী বাতিলের পর প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করে সরকারি দল। পরবর্তীতে নভেম্বরে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা পদত্যাগ করেন ও দেশ ত্যাগ করেন।
মৃত্যুদণ্ড: অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরে বেশ সংখ্যক মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এপ্রিলে দুই জনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসঙ্গত, ট্রাইব্যুনালটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা তদন্তের জন্য প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ট্রাইব্যুনালটির বিচারকার্যে নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যেমন, আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মামলা প্রস্তুত করতে পর্যাপ্ত সময় না দেয়া ও সাক্ষীর সংখ্যা সীমিত করে দেয়া।