
ইরানের প্রভাবকে নিঃশেষ করে দিতে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরিকে পদত্যাগে চাপ প্রয়োগ করেছিল সৌদি আরব। তিনি পদত্যাগের যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তাও নাকি লিখে দিয়েছিলেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। উদ্দেশ্য, ইরানের ক্ষমতা খর্ব করা এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা। নিউ ইয়র্ক টাইমসের উদ্ধৃতি দিয়ে এ খবর প্রকাশ করেছে ডেইলি মেইল।
গত ৪ নভেম্বর অকস্মাৎ সৌদি আরব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন হারিরি। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা এ নিয়ে কথা বলেছেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে। তারা বলেছেন, পদত্যাগে ভীষণরকম চাপ দিয়েছিল সৌদি আরব সরকার। বিশেষ করে এ চাপ এসেছিল ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে। তিনিই হারিরির পদত্যাগপত্র লিখে দিয়েছিলেন বলে দাবি তাদের। তারা আরো অভিযোগ করেন, লেবাননের প্রধানমন্ত্রীকে আটক রাখা হয়েছিল এটা নিশ্চিত হতে যে, তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিচ্ছেন।
সৌদি আরবের অভিযোগ আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে ইরান। বিশেষ করে তারা হিজবুল্লাহকে সমর্থন করছে। তাদের প্রভাবকে নিঃশেষ করে দিতে হবে বলে মনে করে সৌদি আরব। হারিরি ঘনিষ্ঠ ওইসব কর্মকর্তা মনে করেন, সৌদি আরবের এমন কর্মকাণ্ডে আঞ্চলিক সংকট আরো ছড়িয়ে পড়তে পারতো। কিন্তু লেবানন ও পশ্চিমা সরকারগুলোর প্রচণ্ড চাপে শেষ পর্যন্ত সাদ আল হারিরিকে দেশে ফিরতে দেয় সৌদি আরব। তাই তিনি দেশে ফিরেই দ্রুততার সঙ্গে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন পদত্যাগপত্র।
এখানে উল্লেখ্য, লেবাননের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরির পিতা রফিক হারিরি। তিনিও লেবাননের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০০৫ সালে তাকে হত্যা করা হয়। পিতার পথ অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী হন হারিরি। সৌদি আরবের সঙ্গে গড়ে তোলেন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তার রয়েছে লেবানন ও সৌদি আরবের দ্বৈত নাগরিকত্ব। তিনি জন্মেছেন সৌদি আরবেই। সৌদিতে তার ব্যবসায়ী কর্মকাণ্ডে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করা। তাই সৌদি আরব তার কাছে ঘনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ মিত্র।
লেবাননে বর্তমানে ক্ষমতায় জোট সরকার। এই জোটে রয়েছে হিজবুল্লাহ। রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন সৌদি আরব। তারা চায় ইরানের এই প্রভাব কমাতে। কিন্তু তাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছিলেন প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে থাকে সৌদি আরব। ইরানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সাদ আল হারিরি। এরপর গত ৩ নভেম্বর তাকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানায় সৌদি আরব। বলা হয়, মরুভূমিতে ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে একটি দিন কাটাতে। এটাকে ‘সমন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাদ আল হারিরির ঘনিষ্ঠ ওই কর্মকর্তারা বলেছেন, ওই সময় তাকে সব কিছু করতে বাধ্য করে সৌদি কর্মকর্তারা। তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। কেড়ে নেয়া হয় সব কিছু। তবে তার সঙ্গে শুধু একজন দেহরক্ষী থাকতে দেয়া হয়। ওইদিন বিকেলেই আগে থেকে লিখে রাখা বক্তব্য অনুযায়ী সৌদি আরবে টেলিভিশনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন সাদ আল হারিরি। এ ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নেয় ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও মিশর। এমন পদক্ষেপের কারণে হারিরিকে ফেরত পাঠানো হয় লেবাননে।
তবে সৌদি আরবের এক সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, সাদ আল হারিরিকে সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হন নি সাদ আল হারিরি।
উল্লেখ্য, ক্রাউন প্রিন্সের দায়িত্ব নেয়ার আগেই ইয়েমেন যুুদ্ধের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি ওই দেশে বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ দিয়েছেন। ইয়েমেনে হামলায় সেখানে এক মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ক্রাউন প্রিন্সের নির্দেশে সৌদি আরবে ধনী ও গুরুত্বপূর্ণ অনেক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলার জন্য এটা করা হয় বলে প্রচার করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষকরা বলেন, মোহাম্মদ বিন সালমানের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা কুক্ষিগত করা ও সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেয়া। কারণ, গ্রেপ্তার করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের। অন্যদিকে সৌদি আরব সরকারের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বিশেষ করে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে। ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে অনুমোদন পাওয়ার পর সালমানকে টুইটারে প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। তিনি টুইটারে লিখেছেন, বাদশাহ সালমান ও ক্রাউন প্রিন্সের প্রতি তার রয়েছে মহৎ আস্থা। তার সঙ্গে রয়েছে জারেড কুশনারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।