
শান্তি, সৌহার্দ্য আর আনন্দের বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে আবার এল পবিত্র ঈদুল আজহা। রাত পোহালেই ত্যাগের মহিমায় ঈদ উদযাপন করবে দেশবাসী। সবাইকে ঈদ মোবারক!
ঈদুল আজহায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ মহান আল্লাহর উদ্দেশে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করবেন। পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে একজন মুসলমান তার কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা; এই সব রিপুকেই কোরবানি দেন।
ঈদ উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও ঈদ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
ঈদুর আজহায় পশু কোরবানি করার এই ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন। আল্লাহ তাআলা হজরত ইব্রাহিম (আ.)কে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি দিতে। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্য ছিল তার নবীর আনুগত্য পরীক্ষা করা। স্নেহের পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) ছিলেন হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সবচেয়ে প্রিয়। স্নেহমমতায় ভরা জগৎ-সংসারে পিতার পক্ষে আপন পুত্রকে কোরবানি দেওয়া অসম্ভব এক অগ্নিপরীক্ষা। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.) বিনা দ্বিধায় নিজ পুত্রকে কোরবানি দিতে উদ্যত হয়েই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মহান আল্লাহর নির্দেশে তার ছুরির নিচে প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর স্থলে কোরবানি হয়ে যায় একটি দুম্বা। প্রতীকী এই ঘটনার অন্তর্নিহিত বাণী স্রষ্টার প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য ও ত্যাগ স্বীকার।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, কোরবানির মর্ম অনুবাধন করে সমাজে শান্তি ও কল্যাণের পথ রচনা করতে সকলকে সংযম ও ত্যাগের মানসিকতায় উজ্জীবিত হতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানে সকল ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম ও আচার অনুষ্ঠানাদি পালন করে আসছে। এটা বাংলাদেশের সম্প্রীতির এক অনুপম ঐতিহ্য।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেছেন, ঈদ শান্তি, সহমর্মিতা, ত্যাগ ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয়। আসুন, আমরা সকলে পবিত্র ঈদুল-আজহার মর্মবাণী অন্তরে ধারণ করে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জনকল্যাণমুখী কাজে অংশগ্রহণ করি এবং বৈষম্যহীন সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্বের সকল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত প্রতি বছর ঈদুল আজহা আমাদের মাঝে ফিরে আসে। স্বার্থপরতা পরিহার করে মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা কোরবানির প্রধান শিক্ষা। হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-ক্রোধকে পরিহার করে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় আত্মনিবেদিত হওয়া আমাদের কর্তব্য। কোরবানির যে মূল শিক্ষা তা ব্যক্তিজীবনে প্রতিফলিত করে মানবকল্যাণে ব্রতী হওয়ার মাধ্যমে মহান আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিনের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ সম্ভব।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
নগরীর লাখ লাখ বাসিন্দা গ্রামের বাড়িতে আপনজন ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ঈদের খুশি ভাগাভাগি করতে ইতোমধ্যে রাজধানী ছেড়ে গিয়েছেন এবং অনেকে যাচ্ছেন।
উৎসবের আমেজ দিতে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সড়ক দ্বীপ জাতীয় ও ঈদ মোবারক খচিত পতাকা দিয়ে সুশোভিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সব সরকারি-বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা ও ঈদ মোবারক খচিত পতাকা উত্তোলন করা হবে। এ ছাড়া নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের সব কারাগার, সরকারি হাসপাতাল, ভবঘুরে কল্যাণ কেন্দ্র, বৃদ্ধাশ্রম, শিশুসদন, ছোটমনি নিবাস, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র, সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র, সেফ হোমস, দুস্থ কল্যাণ কেন্দ্র এবং শিশু ও মাতৃসদনে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।
হজরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ পুত্রকে কোরবানি দেয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহপাকের নির্দেশে তিনি জীবদ্দশায় প্রতি বছরই পশু কোরবানির মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার আনুগত্যের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)ও এ আদর্শ অনুসরণ ও বহাল রাখতে আদিষ্ট হন। তিনিও তাঁর জীবদ্দশায় প্রতিবছরই কোরবানি করেছেন এবং তাঁর উম্মতদের জন্য এ আদর্শ ও প্রথা অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে গেছেন।
এ আদর্শ অনুসরণের লক্ষ্যে গোটা মুসলিম জাহানের পাশাপাশি বাংলাদেশেও ঈদ উদযাপনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে পশু কোরবানি দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
কোরবানির পশু কেনার জন্য গত কয়েক দিন যাবত গাবতলী পশু হাটসহ রাজধানী ও আশপাশের অস্থায়ী পশু হাটগুলোতে ক্রেতাদের বেশ ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ইতোমধ্যে অনেকে কোরবানির পশু ক্রয় করেছেন। যারা এখনও কেনেননি, তারা সাধ্য ও সামর্থের মধ্যে পছন্দের গরু, ছাগল বা অন্য কোন হালাল পশু ক্রয় করতে হাটে হাটে ঘুরছেন। পশুর বাজার এবার বিক্রেতারা বেশ ভাল দাম পাচ্ছে বলে জানা গেছে।
পবিত্র এ উৎসব উপলক্ষে দৈনিক পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিও বিনোদনমূলক বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
যথাযোগ্য মর্যাদা ও আনন্দ উৎসবের মধ্যদিয়ে ঈদ উদ্যাপনের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্থানীয় পর্যায়ে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলো দেশব্যাপী ঈদ উদ্যাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তাছাড়া বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহে সরকারি কর্মসূচির আলোকে ঈদুল আজহা উদ্যাপনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
ঈদের দিন সকাল ৮টায় দেশের প্রধান ঈদ জামাত জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় ঈদগাহে ঈদুল আজহার নামাজে ইমামতি করবেন বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান। বিকল্প ইমাম হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ঢাকার মিরপুরের জামেয়া আরাবিয়া’র শায়খুল হাদীস মাওলানা সৈয়দ ওয়াহিদুয্যামান।
বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে পর্যায়ক্রমে ৫টি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। বায়তুল মুকাররমে প্রথম জামাত সকাল ৭টা, দ্বিতীয় জামাত সকাল ৮টা, তৃতীয় জামাত সকাল ৯টা, চতুর্থ জামাত সকাল ১০টা এবং পঞ্চম ও সর্বশেষ জামাত সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে অনুষ্ঠিত হবে।
রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ৪০৯টি স্থানে ঈদ জামাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় জাতীয় ঈদগাহ’র প্রধান জামাতসহ ইদুল আজহার ২২৯টি এবং উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ১৮০টি জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে। ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য মুসুল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বিশেষ ট্রেন ও বাস চলাচল করবে।সূত্র- আরটিএনএন