
নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ২৬ আসামির মধ্যে নূর হোসেন, তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, আরিফ হোসেনসহ ১৫ জনের মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে আজ রায় ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট।
চাঞ্চল্যকর এ মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন ।
মৃত্যুদন্ড বহাল থাকা আসামীরা হলেন-সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (চাকরিচ্যুত) এম মাসুদ রানা, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, হাবিলদার মো. এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হিরা মিয়া, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, সৈনিক (চাকরিচ্যুত) আবদুল আলিম, সৈনিক (বরখাস্ত) মহিউদ্দিন মুন্সি, সৈনিক (চাকরিচ্যুত) আল আমিন শরিফ ও সৈনিক (চাকরিচ্যুত) তাজুল ইসলাম। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে আসামী মহিউদ্দিন মুন্সি, আল আমিন শরিফ ও তাজুল ইসলাম পলাতক।
মৃত্যুদন্ডের সাজা কমে যাদের যাবজ্জীবন হয়েছে তারা হলেন- সৈনিক আসাদুজ্জামান নুর, সার্জেন্ট (চাকরিচ্যুত) এনামুল কবীর, নূর হোসেনের সহযোগী মুর্তুজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু ওরফে মিজান, মো. রহম আলী, মো. আবুল বাসার, সেলিম, মো. সানাউল্লাহ ওরফে ছানা (পলাতক), ম্যানেজার শাহজাহান (পলাতক) ও জামাল উদ্দিন।
এ মামলার ৩৫ জন আসামির মধ্যে হাইকোর্ট আজ ১৫ জনের মৃত্যুদন্ড বহাল, ১১ আসামীর সাজা পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং বাকি ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিচারিক আদালতের দেয়া কারাদন্ড বহাল রেখে রায় দিয়েছে।
এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রায়ের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করে বলেন, ‘এ রায় দৃষ্টান্তমূলক। রায়ে আমরা স্বস্তি অনুভব করছি’। তিনি বলেন, ব্যক্তির অপরাধের কারণে কোন বাহিনীকে দায়ী করা যাবে না বলেও রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে। র্যাপিড একশ্যান ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর যে সকল কর্মকর্তা ও সদস্য চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় জড়িত ছিলেন- তাদের প্রত্যেককে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না রায়ে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, সাত খুনের ঘটনায় র্যাব-১১-এর সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেনের সঙ্গে যারা ছিলেন তাদের প্রত্যেকের মৃত্যুদন্ড হাইকোর্টে বহাল রয়েছে। ১১ জনের সাজা কমানোর বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কি-না এ প্রশ্নে এটর্নি জেনারেল বলেন, পুরো রায় পড়ার পর সে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
রায়ে আসামীদের স্বজনরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। ওই ঘটনায় খুনের শিকার কাউন্সিলর নজরুলের শ্বশুর শহিদ চেয়ারম্যান বাসস’এর সঙ্গে আলাপকালে রায়ে তার সন্তুষ্টির কথা জানান। তিনি বলেন, আসামিরা যে ধরনের অপকর্ম করেছে সেসব অপকর্মের উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন,“আমরা রায় কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছি”।
গত ২২ মে সাত খুন মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হয়ে ২৬ জুলাই শেষ হয়। আদালতে আসামিদের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী, এডভোকেটএস এম শাহজাহান, এডভোকেট মো. আহসান উল্লাহ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি এটর্নি জেনারেল জাহিদ সরোয়ার কাজল।
চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলায় গত ১৬ জানুয়ারি সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন ও র্যাবের বরখাস্তকৃত তিন কর্মকর্তাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন রায় দেয়। এ মামলার ৩৫ জন আসামির মধ্যে বাকি ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেয়া হয়েছে।
নয়জনের মধ্যে বিচারিক আদালত কর্পোরাল রুহুল আমীনকে ১০ বছর, এএসআই বজলুর রহমানকে ৭ বছর, হাবিলদার নাসির উদ্দিনকে ৭ বছর, এএসআই আবুল কালাম আজাদকে ১০ বছর, সৈনিক নুরুজ্জামান ১০ বছর, কনস্টেবল বাবুল হাসানকে ১০ বছর, কর্পোরাল (পলাতক) মো. মোখলেছুর রহমানকে অপহরণের দায়ে ১০ বছর, এএসআই কামাল হোসেন (পলাতক) অপহরণের দায়ে ১০ বছর, কনস্টেবল হাবিবুর রহমানকে অপহরণের দায়ে ১০ বছর ও আলামত সরানোর দায়ে ৭ বছর কারাদন্ড দেয়। এ দন্ড আজ হাইকোর্টও বহাল রাখে।
বিচারিক আদালতের ১৬৩ পাতার পূর্ণাঙ্গ রায় গত ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। ওইদিনই পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি, জুডিশিয়াল রেকর্ড, সিডিসহ বিভিন্ন নথিপত্র (ডেথ রেফারেন্স) হাইকোর্টে পৌঁছে দেয় বিচারিক আদালত। প্রধান বিচারপতির নির্দেশে এ মামলার পেপার বুক প্রস্তুতে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া হয়। সে আলোকে গত ৭ মে মামলার পেপার বুক হাইকোর্টে এসেছে।পেপারবুকটি প্রায় ছয় হাজার পৃষ্ঠার।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল বেলা দেড়টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহৃত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন। তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে একে একে ভেসে ওঠে ছয়টি লাশ। পরদিন মেলে আরেকটি লাশ। নিহত অন্যরা হলেন নজরুলের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও চন্দন সরকারের গাড়িচালক মো. ইব্রাহীম।
ঘটনার এক দিন পর কাউন্সিলর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বাদী হয়ে নূর হোসেনসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্ত শেষে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়।সূত্র- বাসস